ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কেপ ভার্দের ‘বালুদস্যু’ নারীদের লড়াই

কেপ ভার্দের ‘বালুদস্যু’ নারীদের লড়াই
×

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বালু তুলছেন ভানিয়া তাভারেস

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলার সুযোগ পেয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্ববাসীর কাছে আলোচনায় এলেও, পর্যটকদের কাছে এটি নীল জলরাশি আর ছবির মতো সুন্দর সৈকতের জন্য আগে থেকেই পরিচিত। কিন্তু সান্তিয়াগো দ্বীপের চার্কো সৈকতের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে কোনো পর্যটক যান না। রুক্ষ, পাথুরে এই উপকূলে আটলান্টিকের আগ্রাসী ঢেউয়ের দিকে পা বাড়ানোর আগে ভানিয়া তাভারেস পরম করুণাময়ের কাছে বুকে ক্রুশ এঁকে প্রার্থনা সেরে নেন। কারণ তিনি জানেন, এই উত্তাল সাগরে একবার পা পিছলে গেলে ফেরাটা বড্ড কঠিন।

ভানিয়া একা নন, মারিয়া এলেনর মন্তেইরোসহ আরও কয়েকজন নারী প্রতিদিন ভাটার সময় এখানে জড়ো হন। তাদের লক্ষ্য সমুদ্রের তলদেশ থেকে কালো বালু তুলে আনা। ১০ কেজিরও বেশি ওজনের বালুভর্তি বালতি মাথায় নিয়ে উত্তাল ঢেউ আর পিচ্ছিল পাথরের সঙ্গে লড়াই করে তারা যখন তীরে ফেরেন, তখন তাদের মনে হয় যেন এক একটি অনন্তকাল পার হলো। চরম দারিদ্র্যপীড়িত এই অঞ্চলের নারীদের কাছে এটি শুধু নিছক কোনো কাজ নয়, বেঁচে থাকার এক মরণপণ লড়াই। গত দেড় দশক ধরে এই নারীরা এই হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে চলেছেন। স্থানীয়রা তাদের নাম দিয়েছেন ‘বালুদস্যু’ বা ‘স্যান্ড থিভস’।

দারিদ্র্য ও শোষণের দুষ্টচক্র
চার্কো সৈকতে প্রতিদিন এক নীরব, ছন্দময় অথচ মর্মান্তিক জীবনযুদ্ধ মঞ্চস্থ হয়। মারিয়ার ছিপছিপে শরীরটা বালতির ভারে দুলতে থাকে। সৈকতের একপাশে তারা এই বালুর স্তূপ তৈরি করেন। কয়েক সপ্তাহ হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর এক ট্রাক্টর বালু বিক্রি করে তারা পান মাত্র ১৪০ ডলার। বৈধ খনি থেকে তোলা বালুর চেয়ে এই দাম অনেক কম হওয়ায় অসাধু ঠিকাদারদের কাছে এই বালুর বেশ কদর রয়েছে।

‘এটিই আমার একমাত্র পথ, অন্য কোনো কাজ আমার নেই’– ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন মারিয়া। পাথরে আছড়ে পড়ে তাঁর পায়ে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই পরিশ্রমে পিঠে স্থায়ী ব্যথা বাসা বেঁধেছে। তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে তো তিন দিন বিছানা থেকেই উঠতে পারি না।’

তাদের গ্রাম থেকে এই দুর্গম সৈকতে আসতে আধা ঘণ্টা হাঁটতে হয়। সেই গ্রামে সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ভানিয়া মাত্র ১৩ বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। গত ১৬ বছর ধরে এই বালু টেনেই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। গ্যাসের দাম দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে হয়, যার বিষাক্ত ধোঁয়ায় চোখ-মুখ জ্বলে যায়। তাঁর বোন ৩২ বছর বয়সী ভানিলদাও তিন সন্তানের একাকী মা; এই বালুই তার সন্তানদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

উন্নয়নের ইটে গাঁথা বিপন্ন পরিবেশ
কেপ ভার্দের মতো একটি দরিদ্র দেশে বালু এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে দেশের নগরায়ণের পেছনে এই অবৈধ বালুর বড় অবদান ছিল। পরিবেশবাদী এনজিও ‘লানতুনা’র পরিচালক আনা ভেইগার মতে, ‘রাজধানী প্রেইয়ার বেশির ভাগ ভবন আক্ষরিক অর্থেই এই নারীদের তোলা বালু দিয়ে তৈরি।’
প্রকৃতির বুক চিরে এভাবে সম্পদ লুটের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। চার্কো সৈকতের আসল রূপ অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ক্রমাগত বালু তোলার ফলে সেখানে এখন শুধুই পাথর আর বড় বড় গর্তের সমাহার। সৈকতে বালু না থাকায় সাঁতার না জানা সত্ত্বেও এই নারীদের বাধ্য হয়ে সমুদ্রের আরও গভীরে যেতে হচ্ছে।

বালু উত্তোলনের প্রভাব শুধু সৈকতেই সীমাবদ্ধ নেই। সান্তা ক্রুজ পৌরসভার কৃষি প্রকৌশলী স্যামুয়েল লিয়েল জানান, বালু তোলার ফলে সমুদ্রের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দ্বীপের পূর্ব দিকের প্রেইয়া দে আরেইয়া গ্রান্দে সৈকতের পেছনের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি আজ বিলীন। সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে আবাদি জমি নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানে এখন শুধুই বুনো বাবলা গাছের সারি। ফলে বাধ্য হয়ে প্রায় ১০০ জন কৃষক তাদের জমি ফেলে চলে গেছেন।

অনুশোচনার কান্না
কেপ ভার্দেতে ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রণীত আইনে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এর জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বেঁচে থাকার মরিয়া লড়াইয়ের কাছে আইন অনেকটাই অসহায়। গত তিন বছরে এই নারীদের একবারও পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়নি। কারণ কর্তৃপক্ষও জানে, তাদের বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান নেই।

সম্প্রতি সচেতনতামূলক প্রচারণার কারণে এ অবৈধ ব্যবসা কিছুটা কমেছে। ভানিয়া জানান, কখনও কখনও এক ট্রাক্টর বালু বিক্রি করতে এক মাসও অপেক্ষা করতে হয়। এনজিও লানতুনার সহায়তায় কিছু নারী এই কাজ ছেড়ে শূকর ও ভেড়া পালনের মতো বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তবে আনা ভেইগা মনে করেন, সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এই নারীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মারিয়া মন্তেইরো আজ আক্ষেপ করেন। নিজের চোখের সামনে দশকের পর দশক ধরে চলা পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞের অংশীদার হওয়ায় তাঁর মনে গভীর অনুশোচনা। তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যখন বলত যে বালু তুললে সৈকত নষ্ট হবে, আমরা বিশ্বাস করিনি। যদি আমি একটু সাহায্য পাই, তবে আমি আর কখনও এখানে বালু তুলতে আসব না।’

মারিয়ার এই আকুতি শুধু একজন নারীর নয়, এটি কেপ ভার্দের হাজারো বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ; যারা জানেন, তারা নিজেদের অস্তিত্বের শিকড় কাটছেন, কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে এর বাইরে তাদের যে আর কোনো উপায় নেই! 

এএফপি অবলম্বনে

আরও পড়ুন

×