সেবা ও জীবনের নতুন সম্পর্ক
একজন রোগী কেবল ওষুধে পুরোপুরি সুস্থ হন না; আসল আরোগ্য আসে সহানুভূতি ও মানবিক স্পর্শে
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মহানগর প্রজেক্টে এক ব্যস্ত সকাল। কোলে সাত মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে চিন্তাচ্ছন্ন কর্মজীবী মা তানিয়া আক্তার। স্বামী একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। যৌথ পরিবারের অবলুপ্তি আর নাগরিক একাকিত্বের এই যুগে শিশুটিকে সুরক্ষিত হাতে রেখে কাজে যাওয়ার কোনো স্বজন নেই তাদের পাশে। অবশেষে তানিয়ার স্বস্তির ঠিকানা হলো একজন পেশাদার ‘কেয়ারগিভার’ বা সেবাদানকারী।
অন্যদিকে, মিরপুরের মোহাম্মদ রেদোয়ানের চিত্রটি ভিন্ন হলেও সংকটটি একই সুতায় গাঁথা। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা–ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাঁর নানি। পরিবারের স্বজনরা পাশে থাকলেও প্রাত্যহিক ফিজিওথেরাপি, সময়মতো ওষুধ সেবন ও মানসিক সাহচর্য দেওয়ার জন্য একজন প্রশিক্ষিত মানুষের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করছিলেন তারা। সে চাহিদাই মেটাচ্ছেন একজন প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার।
তানিয়া বা রেদোয়ানের এই স্বস্তির গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশে নীরবে ঘটে চলেছে এক বড় ধরনের রূপান্তর। একসময় যে সেবাকে কেবল পারিবারিক বা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হতো, আজ তা দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও মানবিকতার সমন্বয়ে এক সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের সমাজে অসুস্থ, শিশু কিংবা প্রবীণদের সেবার প্রাথমিক দায়িত্ব সামলে এসেছেন পরিবারের নারী সদস্য–স্ত্রী, কন্যা বা পুত্রবধূরা। অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও নারীশিক্ষার প্রসারে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৩৭ লাখ। কর্মক্ষেত্রে নারীর এই বিপুল অংশগ্রহণের ফলে পরিবারে গৃহকেন্দ্রিক সেবার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। তদুপরি কর্মসংস্থান বা পড়াশোনার তাগিদে সন্তানদের বড় শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে প্রবীণদের একাকিত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ হবেন প্রবীণ।
আইএলওর একটি পূর্বাভাসে দেখা যায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সেবা খাতে ৩০ কোটির বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হবে; যার মধ্যে কেবল বাংলাদেশেই ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। হাসপাতাল, ডে-কেয়ার এবং বাসাবাড়িতে ক্রমবর্ধমান চাহিদাই ‘কেয়ারগিভিং’ পেশার ভিত্তিমূল মজবুত করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘চিকিৎসক, নার্স এবং কেয়ারগিভার– চিকিৎসাসেবার এ তিন স্তম্ভের দায়িত্ব আলাদা হলেও তারা একে অপরের পরিপূরক। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। নার্সরা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ, ইনজেকশন দেওয়া বা ড্রেসিংয়ের মতো ক্লিনিক্যাল দায়িত্বগুলো পালন করেন। অন্যদিকে, কেয়ারগিভারের কাজ হলো রোগীর প্রাত্যহিক জীবনের ব্যক্তিগত পরিচর্যা। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন বিছানায় শয্যাশায়ী বা নিজের কাজ নিজে করতে সম্পূর্ণ অক্ষম, তাদের জন্য কেয়ারগিভার যেন আশীর্বাদ।’
প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারদের জীবনের গল্পগুলো কেবল তাদের নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার কাহিনি নয়, বরং তা সমাজের এক একটি অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্তও। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর যখন ভবিষ্যতের পথ অন্ধকার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই এক বন্ধুর সূত্রে ‘ইউসেপ বাংলাদেশ’-এর কেয়ারগিভার ট্রেনিং কোর্সের খোঁজ পান মোহাম্মদ রায়হান।
পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা কাটাতে এ প্রশিক্ষণই তাঁর জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউসেফ বাংলাদেশের জব প্লেসমেন্ট টিমের সহায়তায় ‘বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হসপিটালে’ চাকরি পান রায়হান। বর্তমানে ওভারটাইম ও আনুষঙ্গিক সুবিধা মিলিয়ে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। পরিবারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করছেন তিনি।

একইভাবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের পথ তৈরি করেছেন শাবানা খাতুন। বাবার আকস্মিক হৃদরোগে মৃত্যু এবং পরিবারে দাদু-দাদির অসুস্থতা তাঁকে সেবাধর্মের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। অর্থাভাবে নার্স হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও হার মানেননি শাবানা। দিনে ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি আর রাতে পড়াশোনা করে প্যারামেডিকেলে ডিপ্লোমা করেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর করার পাশাপাশি বারডেম হাসপাতালে কেয়ারগিভার হিসেবে নিয়োজিত আছেন।
ধানমন্ডির ‘আয়াত নার্সিং কেয়ার’-এ কাজের শুরুর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে শাবানা বলেন, ‘আমি এমন একজন রোগীর পরিচর্যা শুরু করেছিলাম, যার শরীরে পচন ধরেছিল। আমার আন্তরিক যত্ন ও সেবায় মুগ্ধ হয়ে প্রথম মাসেই প্রতিষ্ঠান আমার বেতন ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকায় উন্নীত করে। রোগী ও তাঁর পরিবার আমাকে আলাদা বোনাসও প্রদান করে।’ শাবানার মতে, একজন রোগী কেবল ওষুধে পুরোপুরি সুস্থ হন না; আসল আরোগ্য আসে সহানুভূতি ও মানবিক স্পর্শে।
সাজিদা ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ ও প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তা সৈকত তালুকদার জয় বলেন, ‘আজকের যুগে এআই অনেক যান্ত্রিক কাজের বিকল্প হতে পারে, কিন্তু কেয়ারগিভিং-এর কোনো প্রযুক্তিগত বিকল্প নেই। কারণ সেবা দিতে হয় মন ও আবেগ থেকে।’
বর্তমানে সাজিদা ফাউন্ডেশনে প্রায় ২০০ জন প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার কাজ করছেন এবং বিগত আট বছরে সহস্রাধিক কেয়ারগিভার সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে তারা জাতীয় দক্ষতা কাঠামোর ‘লেভেল-২’ বা ‘লেভেল-৩’ সনদধারীদের প্রাধান্য দেন, যেখানে রোগীর সঙ্গে আচরণ, সময়ানুবর্তিতা এবং মানসিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তবে সম্ভাবনার চিত্র যতটা উজ্জ্বল, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির চ্যালেঞ্জটি ততটাই বাস্তব। আমাদের সমাজে এখনও কেয়ারগিভারদের সাধারণ গৃহকর্মী বা আয়ার চোখে দেখার প্রবণতা রয়েছে। অথচ এটি একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি ও মানবিক দক্ষতা সম্পন্ন পেশা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, ‘একজন শয্যাশায়ী রোগীকে যদি নিয়মিত (অন্তত দুই ঘণ্টা পরপর) নাড়াচাড়া না করানো হয়, তবে নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে প্রথমে চামড়া এবং পরে মাংস মরে গিয়ে গভীর ক্ষত বা গর্তের সৃষ্টি হয়। এই বিষয়গুলো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেয়ারগিভার জানেন। তবে এই সেবা খাতটিকে আরও কার্যকর ও পেশাদার করতে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিমালা প্রয়োজন।’
- বিষয় :
- রিক্তা রিচি
- কেয়ারগিভার