রাষ্ট্রের কাছে আদিবাসীদের প্রত্যাশা
আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের লোকায়ত জ্ঞান, প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা, ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের সেবা করে আসছে / ছবি :: হাসিনুর রেজা চঞ্চল
ইলিরা দেওয়ান
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। তবে সেটা পালিত হয় বেসরকারিভাবে। জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামে বাংলাদেশ সরকার সরকারিভাবে অংশ নিলেও নিজের দেশে এ দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয় না। অতীতে বিভিন্ন সরকারপ্রধান ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং বিরোধী দলে থাকাকালীন এ দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। পরবর্তীকালে ক্ষমতায় এসে কেউ কেউ শুধু বাণী দেওয়া থেকেই বিরত থাকেননি, বরং ‘আদিবাসী’ শব্দটির সরকারি ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। বিগত সরকারগুলোর এমন আচরণ বা বাস্তবতা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।
এ বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানাই: জীবন ও সুস্থতার সুরক্ষায়’_এ প্রতিপাদ্যের মূল তাৎপর্য হলো আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ধাত্রীবিদ্যার স্বীকৃতি, সম্মান এবং এ জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়নের আহ্বান। যুগ যুগ ধরে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলসহ সমতলের নানা প্রত্যন্ত এলাকায় ধাত্রীরা মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাদের এই অবদান আজও যথাযথ স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল, সমতলের হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, সিলেটের চা-বাগান, মৌলভীবাজারের খাসিয়াপুঞ্জিসহ দেশের বহু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। রাস্তাঘাটের সীমাবদ্ধতা, যানবাহনের অপ্রতুলতা এবং কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রসূতি মাকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় ধাত্রীরাই অনেক ক্ষেত্রে মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন। তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং মানুষের আস্থার কারণে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে বলা যায়, আদিবাসী ধাত্রীদের যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতারও যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোকায়ত জ্ঞান কেবল ধাত্রীবিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্মরণাতীতকাল থেকে তারা প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা, ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের সেবা করে আসছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশের আগে এই জ্ঞানই ছিল তাদের প্রধান অবলম্বন। আজও অনেক ভেষজ উদ্ভিদ ও লোকজ চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্বীকৃতি পাচ্ছে। তাই এ জ্ঞানকে অবহেলা না করে গবেষণার মাধ্যমে যাচাই, সংরক্ষণ এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে উন্নয়ন করা সময়ের দাবি। উন্নয়নের নামে অনেক সময় বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংস, নদী দখল এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অকাল বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি, ভূমিধসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে শিক্ষা আদিবাসী সমাজ যুগ যুগ ধরে লালন করে এসেছে, তা থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তাদের ঐতিহ্যগত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জ্ঞান টেকসই উন্নয়নের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রেইনবো নেশন’ বা বৈচিত্র্যকে সম্মান করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেছে। সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ আলোচনা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের ভূমির অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবিগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রকৃত অর্থে একটি রেইনবো নেশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে আদিবাসীসহ দেশের সব প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার কারণে কোনো নাগরিক যেন তাঁর সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলব, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের শুধু আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানাতেই আহ্বান জানায় না; বরং আদিবাসীর লোকায়ত জ্ঞান, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের অবদান ও নাগরিক অধিকারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।
এখনই সময়–কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ করার যে, এ রাষ্ট্র সব নাগরিকের। আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, লোকায়ত জ্ঞানের সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সব জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি সত্যিকার অর্থে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী