ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

পিয়ার খামারে সবুজ উদ্যোগ

পিয়ার খামারে সবুজ উদ্যোগ
×

নিজের খামারে পিয়া বিশ্বাস

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৩ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তনের রুক্ষ থাবায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার লাউতাড়া গ্রামও এর ব্যতিক্রম নয়। তীব্র তাপপ্রবাহ, ক্রমশ নিচে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং গবাদি পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তীব্র সংকট–সব মিলিয়ে এখানকার গবাদি পশুপালন খাত এক গভীর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছিল। টিকে থাকার লড়াই যখন প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন লাউতাড়া গ্রামের অদম্য নারী পিয়া বিশ্বাস।

২০১৫ সাল থেকে সনাতন পদ্ধতিতে গাভি পালন করে আসা পিয়া আজ নিজ এলাকায় ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’ বা গ্রিন গ্রোথের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে মুনাফা বৃদ্ধি এবং খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো একসময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোকে তিনি জয় করেছেন আধুনিক প্রযুক্তি আর পরিবেশবান্ধব দর্শনের হাত ধরে।

এই পরিবর্তনের শুরুটা হয় ২০২৫ সালে। বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে পরিচালিত ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)’ প্রকল্পের আওতায় পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থা ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’ একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাদের একটি প্রকল্প পিয়া বিশ্বাসের খামারে নতুন দিনের সূচনা করে।

উপ-প্রকল্পের নিবিড় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় পিয়া পরিচিত হন ‘রিসোর্স-এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন’ বা আরইসিপি (সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন) পদ্ধতির সঙ্গে। এটি কেবল খামার ব্যবস্থাপনার কোনো সাধারণ কৌশল নয়; বরং এটি এমন এক আধুনিক উৎপাদন দর্শন, যা সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে অপচয় রোধ করে এবং কার্বন নিঃসরণ বহুলাংশে কমিয়ে আনে।

পিয়া তাঁর খামারে একযোগে সাতটি অত্যাধুনিক আরইসিপি প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন। সনাতন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে তিনি খামারে স্থাপন করেছেন পরিবেশবান্ধব সৌরচালিত মাল্টি-হেড ফগার ও ফ্যান সিস্টেম। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের অবাধ প্রবেশের জন্য খামারের শেডে স্বচ্ছ প্লাস্টিক শিটের ব্যবহার শুরু করেছেন। এর ফলে দিনের বেলায় যেমন কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তেমনি আধুনিক শেড ও ফগার ব্যবস্থাপনার কারণে তীব্র গরমেও খামারের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে। এতে গবাদি পশু হিট স্ট্রোকের মতো ভয়ংকর ঝুঁকি ও অন্যান্য রোগবালাই থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকছে।

শুধু জ্বালানি বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণই নয়, গবাদি পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গরুর গোবরকে পিয়া এখন পরিণত করছেন মূল্যবান ‘ভার্মিকম্পোস্ট’ বা কেঁচো সারে। এই উদ্যোগ একদিকে খামারের চারপাশের পরিবেশকে রাখছে পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধমুক্ত, অন্যদিকে উন্নতমানের এই জৈব সার বিক্রি করে তিনি পাচ্ছেন বাড়তি আয়ের এক চমৎকার উৎস।

নিজের এই রূপান্তরের গল্প বলতে গিয়ে তিন সন্তানের জননী পিয়া বিশ্বাসের চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘সোলার প্যানেল বসানোর আগে প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকার বিশাল বিদ্যুৎ বিল টানতে হতো। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পর সেই বিল কমে এখন মাত্র এক হাজার ছয়শ টাকায় নেমে এসেছে! দিনের বেলায় এখন পুরো খামার সৌরবিদ্যুৎ দিয়েই চলে। আর পাইপ দিয়ে সরাসরি গরু ধোয়ার বদলে মাল্টি-হেড ফগার ব্যবহারের কারণে পানির অপচয় একেবারেই বন্ধ হয়েছে; শ্রম ও সময় দুটোই বেঁচেছে। তবে সবচেয়ে বড় ম্যাজিকটা ঘটেছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। গোবরকে এখন আর ফেলনা মনে করি না, আধুনিক পদ্ধতিতে তা থেকে কেঁচো সার বানাচ্ছি। এই সার বিক্রি করে প্রতি মাসে যে লাভ আসছে, তা আগে কখনও ভাবতেই পারিনি।’

পিয়া বিশ্বাসের এই সাফল্য শুধু একটি পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে যে পরিবেশের ক্ষতি না করেও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর খামারে একদিকে যেমন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা। এটি একটি নিখুঁত ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির বাস্তব উদাহরণ, যেখানে খামারের বর্জ্যই আবার মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে প্রকৃতি ও অর্থনীতি উভয়কেই পুষ্ট করছে। 

আরও পড়ুন

×