ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

আর্ট থেরাপিতে শানিত নারী আন্দোলন

আর্ট থেরাপিতে শানিত নারী আন্দোলন
×

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং ‘বহ্নিশিখা’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত উদ্যোগের মূল উপজীব্য ছিল ‘মানসিক স্বাস্থ্য ও আর্ট থেরাপি’

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১১ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শব্দ যেখানে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেখানে কথা বলে রং আর তুলি। আমাদের সমাজে নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষেরা প্রতিদিন যে অদৃশ্য শৃঙ্খল আর সহিংসতার মধ্য দিয়ে যান, তার সবটুকু কি কেবল ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব? হয়তো না। সেই না-বলা কষ্ট, জমে থাকা অভিমান আর মানসিক ট্রমাগুলো যখন ক্যানভাসে আছড়ে পড়ে, তখন তা আর কেবল একটি চিত্রকর্ম থাকে না; হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক নীরব অথচ শক্তিশালী ভাষা। এমন এক ব্যতিক্রমী ও মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়মূলক ভাবনার বাস্তব রূপায়ণ ঘটল গত ৩১ জুলাই (শুক্রবার)। ঢাকার দ্বীপ গ্যালারির নিভৃত পরিসর এদিন হয়ে উঠেছিল মানসিক মুক্তির এক অভয়ারণ্য।

‘আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নারী আন্দোলন শক্তিশালী করি’–এই সময়োপযোগী প্রকল্পটিকে সামনে রেখে বিভাগীয় পর্যায়ে একটি সংহতি বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং ‘বহ্নিশিখা’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেশনের মূল উপজীব্য ছিল ‘মানসিক স্বাস্থ্য ও আর্ট থেরাপি’। ইউএন উইমেন বাংলাদেশ-এর সার্বিক সহযোগিতায় দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলা এই নিবিড় আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন নানা বয়স ও পেশার ৪৩ জন প্রতিনিধি। পুরো সেশনটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন ‘সম্ভব ইয়ুথ অর্গানাইজেশন’-এর একদল উদ্যমী তরুণ।

আর্ট থেরাপি কেবল ছবি আঁকা নয়, এটি মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়ের এক বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক প্রক্রিয়া। সেশনটি অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করেন প্রখ্যাত মানসিক স্বাস্থ্যবিদ রেহনুমা হক এবং সুষমা অনন্যা। সেশনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা অত্যন্ত মনোগ্রাহীভাবে তুলে ধরেন, কীভাবে একটি তুলির আঁচড় মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা পুরোনো ক্ষতকে সারিয়ে তুলতে পারে। সমাজে নারী, কন্যাশিশু কিংবা লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষেরা প্রতিনিয়ত যে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা, বৈষম্য বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন, তা তাদের ভেতরে গভীর মানসিক ক্ষত বা ‘ট্রমা’ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক নীরবতা, সামাজিক অসহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দীর্ঘসূত্রতা তাদের এই যন্ত্রণাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, ভুক্তভোগীরা ক্রমশ নিজেদের গুটিয়ে নেন, তৈরি হয় বিষণ্নতা আর একাকিত্ব।

আর্ট থেরাপি ঠিক এই জায়গাতেই কাজ করে। এটি এমন এক নিরাপদ বলয় তৈরি করে, যেখানে কোনো বিচার বা সমালোচনার ভয় ছাড়াই একজন মানুষ তাঁর অবদমিত কষ্টগুলোকে রঙের মাধ্যমে বাইরে বের করে আনতে পারেন। অংশগ্রহণকারীদের সামনে যখন শূন্য ক্যানভাস আর রং তুলে দেওয়া হলো, গ্যালারির পরিবেশ যেন এক অন্যরকম গভীরতায় ছেয়ে যায়। কেউ নীল রঙে আঁকলেন তাঁর বিষাদের গল্প, কেউবা লাল রঙে ফুটিয়ে তুললেন জমানো ক্ষোভ আর প্রতিবাদের ভাষা। নিজেদের জীবনের অব্যক্ত অভিজ্ঞতা, ভয়ভীতি আর যন্ত্রণার কথাগুলো তারা পরম মমতায় আর সাহসিকতায় তুলে আনলেন ক্যানভাসে।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, তখন শুরু হলো এক অনন্য প্রদর্শনী। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলা এই প্রদর্শনীতে উঠে এলো ৪৩টি আলাদা গল্প; যা মূলত আমাদের সমাজেরই এক অমোঘ প্রতিচ্ছবি। এই চিত্রকর্মগুলো কেবল তাদের কষ্টের কথাই বলেনি; বরং সেই কষ্ট জয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য স্পৃহারও সাক্ষ্য দিয়েছে। মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে উজ্জীবিত করতে এই মাধ্যমটি যে কতটা যুগান্তকারী, প্রদর্শনীটি তারই প্রমাণ।

ব্যক্তির মানসিক নিরাময় ছাড়া কখনোই একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ‘আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নারী আন্দোলন শক্তিশালী করি’ শীর্ষক প্রকল্পের মূল দর্শনও এটিই। প্রকল্পটি দেশব্যাপী এমন একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম বা কোয়ালিশন তৈরি করতে চায়, যেখানে বিভিন্ন প্রজন্মের এবং নানা পেশায় যুক্ত আন্দোলনকর্মীরা এক ছাতার নিচে আসবেন। বর্তমান যুগে যে কোনো সংকট বা বাধা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকরী। প্রবীণদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা এবং নবীনদের উদ্ভাবনী চিন্তার মেলবন্ধনে স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এমন একটি নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা নারী আন্দোলনকে একটি টেকসই এবং মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ যখন নিজের ভেতরের কষ্টগুলোকে শৈল্পিক উপায়ে প্রকাশ করতে শেখেন, তখন তিনি কেবল নিজের ট্রমা থেকেই বেরিয়ে আসেন না; বরং হয়ে ওঠেন সমাজের অন্য দশজন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। ঢাকা বিভাগীয় এই আর্ট ওয়ার্কশপটি সেই জাগরণেরই এক ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। রং, তুলি আর ক্যানভাসের এই মেলবন্ধন কেবল গ্যালারির চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি স্তরে, যা আগামী দিনের নারী আন্দোলনকে করবে আরও বেশি সংহত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অপ্রতিরোধ্য। 

আরও পড়ুন

×