ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লুকানো খিদে ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য

লুকানো খিদে ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য
×

প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থেকে অনেক শিশু বঞ্চিত থেকে যায়

চৌধুরী নাঈম আহমেদ মুজিব

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:২৭

বিগত দুই দশকে শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এ দৃশ্যমান সাফল্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক নীরব সংকট–শিশুর পুষ্টিহীনতা। আপাতদৃষ্টিতে কোনো শিশুকে সুস্থ ও প্রাণবন্ত মনে হলেও তার ভেতরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে পারে এক অদৃশ্য শত্রু। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২৮ শতাংশ আজও খর্বাকৃতি বা ‘স্টান্টিং’-এর শিকার। অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় ও সুষম পুষ্টির অভাবে বয়স অনুযায়ী তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ১০ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির অন্যতম সূচক ‘ওয়েস্টিং’ বা উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত কৃশতায় ভুগছে।

সাধারণত অপুষ্টি বলতে আমরা বুঝি পরিমিত খাবারের অভাব। বাস্তবতার ক্যানভাস আরও জটিল। অনেক শিশু প্রতিদিন পেট ভরে ভাত বা স্বাভাবিক খাবার খেলেও তাদের শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। 
পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ‘লুকানো খিদে’ বা হাইডেন হাঙ্গার। অর্থাৎ, একজন শিশু ক্যালোরি হয়তো পাচ্ছে, কিন্তু যে অণুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট তার শরীর ও মেধার ভিত্তি গড়ে তোলে, তা থেকে যাচ্ছে অধরা।

খাবার আমাদের দৈনন্দিন কাজের শক্তি জোগায় সত্যি, কিন্তু একটি শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য কেবল ক্যালোরি যথেষ্ট নয়। শরীরের বৃদ্ধি, স্নায়ুর বিকাশ এবং সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষায় আয়রন, জিংক, আয়োডিন, ভিটামিন ‘এ’ ও ক্যালসিয়ামের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এসব উপাদানের ঘাটতি থাকলে বাইরে থেকে পেটে ক্ষুধা না থাকলেও ভেতরে ভেতরে শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপুষ্টির মুখোমুখি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে ‘ফর্টিফাইড’ বা প্রক্রিয়াজাত অতিরিক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। ফর্টিফিকেশন হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে প্রতিদিনের পরিচিত খাবারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যুক্ত করা হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে ফর্টিফাইড খাবার যুক্ত করা সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য কৌশলগুলোর একটি।

বিশ্বজুড়ে আয়োডিনের অভাবজনিত গলগণ্ড রোগ, রক্তস্বল্পতা কিংবা ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ফর্টিফিকেশনের সফল প্রয়োগ দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এর একটি ইতিবাচক উদাহরণ হলো গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেডের ‘শক্তি+’ দই। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত দুধ দিয়ে তৈরি এই দইয়ে শিশুদের জন্য আবশ্যক কিছু অণুপুষ্টি কৃত্রিমভাবে যুক্ত করা হয়, যেন তা শিশুদের পরিচিত স্বাদের সঙ্গে সহজে পুষ্টির জোগান দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে ফর্টিফাইড দইয়ের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালিত হয়, যা পরে আন্তর্জাতিক সমাদৃত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ দইয়ের তুলনায় ফর্টিফাইড ‘শক্তি+’ দই গ্রহণকারী স্কুলগামী শিশুদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, আয়োডিনের সূচক এবং শারীরিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ, প্রতিদিনের খাবারে সামান্য পুষ্টির সংযোজনও শিশুর বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ফর্টিফাইড খাবার অপুষ্টি দূরীকরণের একমাত্র বা জাদুকরী সমাধান নয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সার্বিক পরিবেশের উন্নয়ন। খাদ্য তালিকায় বহুমুখিতা ও সুষম খাবারের সহজলভ্যতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, মাতৃদুগ্ধ পান এবং পরিবারে পুষ্টি সচেতনতা–প্রতিটি উপাদান শিশুর বিকাশে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একক পণ্য বা আংশিক উদ্যোগ দিয়ে শিশু অপুষ্টির বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

তবুও দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে যে পুষ্টির অদৃশ্য শূন্যতা থেকে যায়, তা পূরণে ফর্টিফাইড খাবার একটি মজবুত সেতু হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত ও মেধাবী জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখছে, তখন ‘শক্তি+’-এর মতো অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়–পরিচিত খাবারের পুষ্টিমান বাড়িয়ে শিশুর মেধা ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

আজকের বাংলাদেশে প্রতিটি পরিবারের কাছে বড় প্রশ্ন কেবল এটি হওয়া উচিত নয়–‘শিশুর পেট ভরেছে তো?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত–‘তার পেট ভরার পাশাপাশি কি নিশ্চিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি?’ কারণ, আজকের শিশুটি পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের মেধা, স্বাস্থ্য ও সম্ভাবনা।

লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট

আরও পড়ুন

×