ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক

ইইউতে রপ্তানি ভিয়েতনামের তিন গুণ, যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধেক

ইইউতে রপ্তানি ভিয়েতনামের তিন গুণ, যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধেক
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। বিশ্ববাজারে এই দুই দেশ দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রধান রপ্তানিকারক। দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এতে সার্বিকভাবে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। গত বছর পর্যন্ত টানা চার বছর বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে। গত বছর ২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বলছে, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ভিয়েতনামের তিন গুণ। তবে বিপরীত চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির এই পরিমাণ ভিয়েতনামের অর্ধেক। 

জোটগতভাবে ইইউ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আসে এ জোটের দেশগুলো থেকে। একক দেশ হিসেবে প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো। আপাতত বাড়লেও ইইউতে রপ্তানির সন্তোষজনক এই গতি ধরে রাখা কঠিন হবে আগামীতে। কারণ, ২০১৯ সালের জুনে জোটের সঙ্গে ভিয়েতনামের এফটিএ সই হয়েছে। পরের বছর আগস্ট থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা আংশিক কার্যকর হয়। এতে জোটে ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়ছে। আগামী বছর ভিয়েতনামের সঙ্গে এফটিএ শতভাগ কার্যকর হবে। তখন দেশটি রপ্তানিতে অনেক বেশি শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে। একইভাবে গত মাসে ভারতের সঙ্গেও এফটিএ সই হয়েছে ভিয়েতনামের। এতে ইইউতে বাংলাদেশের হিস্যায় ভাগ বসাবে ভারতও। এতদিন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ ছিল ভারতীয় পণ্যে। 

অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। আগামী নভেম্বরে এলডিসি থেকে মধ্যম উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের। উত্তরণের পরবর্তী তিন বছর বর্তমানের মতোই শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। এ মেয়াদ শেষ হলেই বাংলাদেশের পণ্যে ৯ শতাংশ শুল্কারোপ হবে। অর্থাৎ বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো এবং ভিয়েতনামের ৯ শতাংশ শুল্করোপ বাস্তবতায় বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কারোপ দাঁড়াবে ভিয়েতনামের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি।

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, একাধিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সব সময় ভিয়েতনাম এগিয়ে থাকে। প্রথমত, তাদের পণ্যে মূল্য সংযোজন বেশি। এ কারণে দামও বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এ সুবিধায় পরিমাণে কম রপ্তানি করেও তারা বেশি আয় পায়। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা থেকে শুরু করে তাদের হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সময় অর্থাৎ লিড টাইম। এই লিড টাইমেও তারা এগিয়ে। চীনের প্রতিবেশী হওয়ায় সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী সুবিধায় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে তারা। এতে তাদের লিডটাইম কম লাগে। 

তিনি বলেন, সব ধরনের পণ্যের বেলায় লিড টাইমটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল্য সংযোজিত এবং ফ্যাশন পণ্যের বেলায় লিডটাইম ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কলে বিবেচিত হয়। এরকম কিছু কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেশি। অন্যদিকে ইউরোপে রপ্তানিতে বাংলাদেশের ভালো করার বড় কারণ হচ্ছে– শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা। এই সুবিধায় এখনও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তবে আগামীতে ইইউর সঙ্গে ভিয়েতনামের এফটিএ শতভাগ কার্যকর হলে বাংলাদেশের এই সুবিধা আর থাকবে না। তখন হয়তো পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইইউ বাজারেও বাংলাদেশ বর্তমান মজবুত অবস্থান হারাবে। 

ইইউর বাজারে হিস্যা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যউপাত্ত বলছে, গত বছর ইইউর বাজারে রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা আরও কিছুটা বেড়েছে। গত বছর ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির হিস্যা ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯৪১ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের পোশাক। আগের বছর যা ছিল ১ হাজার ৮৩২ কোটি ডলারের কাছাকাছি। গত ৫ বছরের তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতেও প্রতি বছরই বাংলাদেশের হিস্যা বেড়েছে। ৫ বছর আগে ২০২১ সালে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৯৬ কোটি ডলার।

আর ইইউতে গত বছর ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিতে হিস্যা ছিল ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। রপ্তানির পরিমাণ ৪৩৮ কোটি ডলারের কিছু কম। ২০২৪ সালে হিস্যা ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত কয়েক বছর ধরে ইইউতে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ হিস্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২১ সালে ইউইউ জোটে দেশটির রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৮৬ কোটি ডলার।
ইইউর বাজারে রপ্তানিতে এখনও চীন শীর্ষে রয়েছে। জোটে পোশাক রপ্তানিতে চীনের হিস্যা ২৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের হিস্যা ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ইইউতে রপ্তানিতে ভিয়েতনামের অবস্থান ষষ্ঠ। তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশে তুরস্ক। দেশটির হিস্যা ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতের হিস্যা ৫ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা কম্বোডিয়ার হিস্যা ৫ শতাংশ। ভিয়েতনামের ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশের অন্য দেশগুলো যথাক্রমে পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। 

২০২০ সালে ইইউ-ভিয়েতনাম এফটিএ সইয়ের পর কার্যকর হয়। এখন পর্যন্ত ভিয়েতনামের ৭১ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা ভোগ করছে। বাকি পণ্যগুলোতে বর্তমানে ৪ থেকে ৬ শতাংশ হারে শুল্কারোপ রয়েছে। এতেই ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। গত বছর ইইউতে ভিয়েতনামের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে ভিয়েতনামের পোশাক পণ্যে গড়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্কারোপ রয়েছে। এর বিপরীতে অস্ত্র বাদে সব পণ্য (ইবিএ) স্কিমের আওতায় বাংলাদেশের পণ্য এখনও শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে। এ সুবিধায় গত বছর পর্যন্ত পোশাকের রপ্তানি ইইউর মোট আমদানির ২১ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ তৈরি পোশাকে এখনও বাংলাদেশ আধিপত্য বজায় রেখেছে। 
ভারত ইইউর সঙ্গে এফটিএ সই করেছে গত ১৯ জানুয়ারি। চুক্তিটা অবশ্য এখনই কার্যকর হচ্ছে না। বছরের শেষ দিকে কার্যকর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইইউর সদস্য দেশগুলো এই চুক্তিতে সম্মতি দিলে হতে পারে। আগামী বছর চুক্তি কার্যকর হলে ইইউতে ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে। সাত বছরের মধ্যে এই সুবিধা ৯৩ শতাংশে উন্নীত হবে। প্রথম বছর থেকেই তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ভারত। এই পণ্যগুলোই বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্য। 

যুক্তরাষ্ট্র বাজারে হিস্যা
যু্ক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮২০ কোটি ডলার। যেখানে দেশটিতে ভিয়েতনামের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ডলারের মতো। ভিয়েতনামের হিস্যা বেড়ে হয়েছে ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ। 

তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ভিয়েতনামের হিস্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে বাংলাদেশের হিস্যা বাড়ছে না। আগের দুই বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের হিস্যা ছিল ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ; যেখানে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ৫ বছর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ভিয়েতনামের ছিল ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। 
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে চীন। গত বছর পর্যন্ত দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে ছিল চীন। এখন দেশটির হিস্যা ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছর যা ছিল ২১ শতাংশের মতো। বাংলাদেশের পরে রয়েছে ভারত। দেশটির হিস্যা ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে থাকার কম্বোডিয়ার হিস্যা ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। বাকি দেশগুলো যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হুন্ডুরাস। 
গত বছর প্রকাশিত বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিওর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জোটগত প্রধান বাজার ইইউ, একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বাজার মিলে গত বছর বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের বছর যা ছিল ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত বছর ভিয়েতনামের হিস্যা দাঁড়ায় ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা কমছে, বাড়ছে ভিয়েতনামের। 

আরও পড়ুন

×