তিন কারণে মিলছে না অনুমতি
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরান বাধা না দেওয়ার ঘোষণা দিলেও হরমুজ প্রণালির ‘রেড জোন’ অতিক্রম করতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী ও জ্বালানি পণ্যবাহী কোনো জাহাজ। ২৭ দিন ধরে আটকে আছে বাংলাদেশের ১২৫ নাবিক ও ক্রু থাকা ৯টি জাহাজ। আটকে আছে জ্বালানি তেল ও তরল গ্যাসের বুকিং থাকা ১১টি জাহাজও। ইরান ছাড় দিলেও তিন কারণে বাংলাদেশ এখনও সফল হয়নি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল ও বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না করা, নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজ চার্টারের কাছে ভাড়া থাকা ও বীমা কোম্পানির অনীহার কারণে এখনও হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী কিংবা পণ্যবাহী কোনো জাহাজ। অথচ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এরই মধ্যে ভারত তাদের জ্বালানি বোঝাই দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে দেশে নিয়ে এসেছে। অনুমতি পেয়েছে তাদের আরও তিনটি জাহাজ। মালয়েশিয়া এবং জাপানও জাহাজ নেওয়ার অনুমতি নিয়েছে। অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পাকিস্তানও।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় সপ্তাহেই বাংলাদেশ, ভারতসহ কয়েকটি দেশের জাহাজ চলাচলে বিধি-নিষেধ শিথিল করে ইরান। গত ২৬ মার্চও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বাংলাদেশসহ ‘বন্ধুপ্রতিম’ পাঁচ দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়ার ঘোষণা দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে এবং আটকে পড়া নাবিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। তা না হলে নাবিকদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুত নিয়েও তৈরি হবে নতুন উদ্বেগ।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘আমাদের মালিকানাধীন বাংলার জয়যাত্রা নামে জাহাজটি বেশ কয়েকবার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় জাহাজটিকে পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পার করে আরব সাগরে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এজন্য ঈদের আগেই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছি আমরা। এই চিঠির অনুলিপি পাঠিয়েছি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও। সেখান থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখনও অনুমতি পায়নি। তবে ইরান সম্প্রতি বাংলাদেশের আটকে থাকা জাহাজের তালিকা চেয়েছে বলে শুনেছি।’
সফল হয়েছে ভারত, তৎপর পাকিস্তানও
কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এরই মধ্যে ভারত তাদের জ্বালানি বোঝাই দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে দেশে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। পথে আছে তাদের আরও তিনটি জাহাজ। পাকিস্তানও সম্প্রতি তাদের কনটেইনার বোঝাই একটি জাহাজ রেড জোন অতিক্রম করে দেশে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে আগে ট্রানজিট অনুমতি না নেওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচিগামী ‘সেলেন’ নামে জাহাজটি মাঝপথ থেকেই ঘুরিয়ে দেয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে চলাচল করলে পাকিস্তানের জাহাজও অনুমতি পাবে বলে জানিয়েছে ইরান।
বাংলাদেশকে বাধা না দেওয়ার ঘোষণা
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এই জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এই বন্ধুতালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানও রয়েছে।
শারজাহর আউটারে ‘বাংলার জয়যাত্রা’
বাংলার জয়যাত্রা জাহাজে থাকা ৩১ নাবিক ও ক্রু অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। যুদ্ধ শুরুর পরপর জাহাজটি জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায়। তাদের ৫০০ গজের মধ্যেই তেলের ডিপোতে ড্রোন হামলা করে ইরান। সেখানে পণ্য খালাস করে পরে তারা কিছুটা সরে এসে শারজাহর আউটার পোর্ট লিমিটের মধ্যে অবস্থান নেয়। জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে চার্টার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে বিএসসি। জাহাজটি এখন শারজাহর বহির্নোঙরে আছে।
৯ জাহাজে থাকা ১২৫ নাবিক ও ক্রু
বাংলার জয়যাত্রাসহ হরমুজ প্রণালির আশপাশে ঝুঁকির মধ্যে আছে বাংলাদেশের নাবিকবাহী ৯টি জাহাজ। এর মধ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ আছে চারটি, যেগুলোর সব নাবিক ও ক্রু বাংলাদেশি। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, এর বাইরে ওমান বন্দরের কাছাকাছি স্থানে থাকা এমভি লাকি ড্রাগনে পাঁচজন, হরমুজ প্রণালি থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা এমভি দাতো লাকি জাহাজে ছয়জন, সৌদি আরবের রেড সিতে নোঙর থাকা এমভি নাজিয়া জাহান জাহাজে ২৩ জন, এমভি বাহারি ট্রেডারে একজন, এমভি ফরেভার হ্যাপি জাহাজে ১৫ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু আছেন। বসুন্ধরা এলপিজি চ্যালেঞ্জার নামে আরেকটি জাহাজ থাকলেও সেখানে ঠিক কতজন নাবিক ও ক্রু আছেন, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
হরমুজ প্রণালির রেড জোনে জাহাজ চলাচল
ইরান ছাড় দিলেও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না করা, নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজ চার্টারের কাছে ভাড়া থাকা ও বীমা কোম্পানির অনীহার কারণে এখনও হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী বা পণ্যবাহী জাহাজ
- বিষয় :
- হরমুজ প্রণালী
