ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ভ্যাট অডিট সহজ হচ্ছে তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিল করা যাবে

ভ্যাট অডিট সহজ হচ্ছে তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিল করা যাবে
×

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক বোঝা ও হয়রানি কমাতে মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর (ত্রৈমাসিক) রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের আর সনাতন পদ্ধতিতে কাগজপত্র জমা দিতে হবে না। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান অডিটের আওতায় এলেও তাদের সশরীরে নথিপত্র দাখিল করতে হবে না।

এনবিআরের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এতে সময়, ব্যয় ও হয়রানি কমবে, ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকর করতে সিটিজেন চার্টারে নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী প্রতিটি আবেদন ও সেবার বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাবেন।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রতি মাসে হিসাব সংরক্ষণ, রিটার্ন প্রস্তুত এবং তা জমা দেওয়াকে একটি বড় প্রশাসনিক জটিলতা, হয়রানি ও বাড়তি খরচের বিষয় বলে অভিযোগ করে আসছিলেন। এই ঝামেলার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট জালের বাইরেও থেকে যাচ্ছে। তাদের ভ্যাট প্রদান সহজ করা ও ভ্যাট জালে আনতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। 
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত সব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হয়। তবে আগামী বাজেটে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবে।

পাশাপাশি ভ্যাটের অডিট বা নিরীক্ষা ও ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ পদ্ধতি আরও সহজ করা হতে পারে, যাতে যে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজে নিজেই নিবন্ধন করতে পারে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে গেলে ভ্যাট কমিশনারেট, বিভাগীয় কার্যালয়, সার্কেলের অনুমোদন, মাঠে প্রতিষ্ঠান যাচাইসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ভবিষ্যতে শুধু ভ্যাট নিবন্ধন নয়, সুনির্দিষ্ট ভ্যাট প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেই অনলাইনে তার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করতে পারবে।

এনবিআরের তথ্যমতে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান (বিআইএন) সাত লাখ ৯২ হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ তিন লাখ ১৬ হাজার ৬১৪টি ক্ষুদ্র খাতের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সেবা খাতে তিন লাখ ১৬ হাজার ১৫৩টি, আমদানি ও রপ্তানি খাতের ৯৭ হাজার ৩৯১টি, উৎপাদন খাতে ৪৭ হাজার ৯৯৩টি ও অন্যান্য খাতে ১৪ হাজার ২৪৭টি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে রেকর্ড এক লাখ ৩১ হাজার নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট জালের আওতায় আসে। এই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের।

রাজস্ব বোর্ডের একজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে ভ্যাট দিতে পারে সেজন্য বাজেটে নানা পদক্ষেপ থাকবে। এর অংশ হিসেবে রিটেইল খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। কারণ এই খাতের ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, প্রতি মাসে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকায় ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো অপ্রয়োজনীয় চাপ অনুভব করে। তাই তিন মাস পরপর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে তার আগের মাসের রিটার্ন জমা দিতে হয়। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসের ক্রয়-বিক্রয়, ভ্যাট পরিশোধ ও কর সমন্বয়ের তথ্য ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। রিটার্নে করদাতাকে মোট বিক্রয়, করযোগ্য সরবরাহ, ক্রয়, আমদানি, প্রদেয় ভ্যাট, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ভ্যাটের বিস্তারিত হিসাব দিতে হয়। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা ও সুদ গুনতে হয়। এ ছাড়া এনবিআর ইচ্ছা করলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিতে পারে। নতুন নিয়মে বছরে ১২ বার নয়, চারবার ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের বেশি লেনদেন না থাকলে রিটার্ন দেওয়া লাগে না। তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দিলে ছোট ব্যবসায়ীরা ভ্যাট প্রদানে আগ্রহী হবে। এতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে।

রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হতে পারে। ফলে ব্যবসায়ীকে কাগজপত্র জমা দিতে হবে না। এমনকি অডিটের আওতায় এলেও প্রতিষ্ঠানকে নথিপত্র দাখিল করতে হবে না। এ ছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাটের অডিটও সহজ করা হচ্ছে। ভ্যাটের ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের মাধ্যমে যাবতীয় হিসাব রাখলেই মিলবে ওই সুবিধা। আগের মতো ম্যানুয়াল অডিট হবে না।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘ভ্যাট রিটার্ন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে দাখিলের সুযোগ এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থার দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য মাসিক রিটার্ন দাখিল একটি বড় প্রশাসনিক বোঝা ছিল। নতুন ব্যবস্থা সময়, ব্যয় ও হয়রানি কমাবে, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করবে এবং কর পরিপালন বৃদ্ধি করবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি ডিজিটাল অডিট ও অনলাইন নথি দাখিল কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা আরও শক্তিশালী করবে। তবে এই পদক্ষেপটি বাস্তবায়নে প্রতিটি আবেদন ও সেবার বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে।’
 

আরও পড়ুন

×