ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কম সুদের গৃহঋণে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় আবাসন খাত

কম সুদের গৃহঋণে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় আবাসন খাত
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার প্রত্যাশায় প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন। নতুন চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন তরুণরা, গড়ে উঠছে নতুন পরিবার। ফলে আবাসনের মৌলিক চাহিদা কমে যায়নি। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে।
গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বেড়েছে, একই সঙ্গে ঋণের ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। ফলে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিচ্ছেন সম্ভাব্য ক্রেতারা। ঢাকার আবাসন বাজার নিয়ে কাজ করা একজন বিশ্লেষক জানান, মানুষের ফ্ল্যাট কেনার ইচ্ছা কমেনি। কিন্তু তারা এখন অনেক বেশি হিসাবনিকাশ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছেন রিয়েল এস্টেট উদ্যোক্তারা। একসময় যে প্রকল্পে কয়েক মাসের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য বিক্রি হতো, এখন একই ধরনের প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেক বেশি সময়। বিক্রি ধীর হয়ে গেলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগও পিছিয়ে যায়, আর্থিক চাপও বাড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি। ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টাইলস ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে একদিকে ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রির গতি কমেছে– দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছে আবাসন খাত।

আবাসন শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের আবাসন বাজারের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ক্রেতার নাগালের মধ্যে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি প্রাইম ব্যাংকের ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে শুরু হওয়া নমনীয় সুদহারের গৃহঋণে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। গ্রাহকরা এই হারে নতুন গৃহ ঋণ নিতে পারবেন বা টেকওভার করতে পারবেন। এই হারে গৃহঋণ পেলে আবাসন খাত রাতারাতি বদলে যাবে– এমনটি বলা যাবে না। তবে তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক সুদহার সম্ভাব্য ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ গৃহঋণের সুদের হার শুধু মাসিক কিস্তির হিসাব বদলায় না, বদলে দিতে পারে গ্রাহকের মানসিক প্রস্তুতিও।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, যে পরিবার এতদিন ভেবেছে বাড়ি কেনা হয়তো এখনই সম্ভব নয়, নমনীয় সুদহারের কারণে তারা আবারও প্রকল্প দেখতে যেতে পারেন। কথা বলতে পারেন ব্যাংকের সঙ্গে কিংবা নিজেদের আর্থিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে পারেন। অবশ্যই সব পরিবারের সিদ্ধান্ত একরকম হবে না। চাকরির নিরাপত্তা, আয়ের স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তবু সহজতর অর্থায়ন অনেকের জন্য অপেক্ষার মানসিকতা থেকে পরিকল্পনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্রেতার হাতে পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকলেও তারা পুরো অর্থ একবারে ব্যয় করতে চান না। ভবিষ্যতের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে সঞ্চয় ধরে রাখতে গৃহঋণকেই তুলনামূলক বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে দেখেন। আবাসন পরামর্শকরা জানান, অর্থায়ন সহজ হলে মানুষের প্রশ্ন বদলে যায়। তখন তারা জানতে চান না ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন কিনা, বরং ভাবেন, কোন এলাকায় থাকলে পরিবারের জন্য ভালো হবে।
এই মানসিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু আবাসন কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ফ্ল্যাট বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্থপতি, প্রকৌশলী, নির্মাণশ্রমিক, বিদ্যুৎ ও স্যানিটারি সরঞ্জাম সরবরাহকারী, আসবাব প্রস্তুতকারী, পরিবহন খাত, আইনজীবী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য পেশা ও শিল্প। অর্থনীতিবিদরা তাই আবাসন খাতকে দেশের অন্যতম ‘মাল্টিপ্লায়ার সেক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এই খাতে গতি ফিরলে একসঙ্গে সচল হয় আরও অনেক শিল্প ও সেবা খাত।
ক্রেতাদের আগ্রহ ধরে রাখতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ডেভেলপার কিস্তি সুবিধা, নমনীয় পরিশোধ পরিকল্পনা ও নানা ধরনের অফার দিচ্ছেন। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গৃহঋণের ব্যয় কমানো শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের ওপরই নির্ভর করে। দায়িত্বশীল ঋণনীতি, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার এবং স্বচ্ছ ঋণপ্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করলে আবাসন বাজার আরও কার্যকর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত একটি বাড়ি শুধু ইট-সিমেন্টের নির্মাণ নয়। এটি নিরাপত্তার অনুভূতি, পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং জীবনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতির প্রতীক। প্রাইম ব্যাংকের ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে শুরু হওয়া নমনীয় সুদহারের গৃহঋণ বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা ক্রেতা এবং বিক্রির গতি ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা আবাসন খাত– উভয়ের জন্যই প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন নতুন করে আশার আলো জাগাতে পারে।

আরও পড়ুন

×