ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার

সরকারি নির্মাণকাজে এখনও প্রচলিত ইটের ব্যবহার বেশি

সরকারি নির্মাণকাজে এখনও প্রচলিত ইটের ব্যবহার বেশি
×

জুলকর শাহীন সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ কংক্রিট প্রডাক্ট অ্যান্ড ব্লক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন

জুলকর শাহীন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল: পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারি সব নির্মাণকাজে মাটি পোড়ানো ইটের স্থলে শতভাগ ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে। মাঠ পর্যায়ে সরকারি প্রকল্পসহ অন্যান্য নির্মাণকাজে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতটা দেখছেন?

জুলকর শাহীন: পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে আন্তরিক হলেও দুঃখের বিষয়, মাঠ পর্যায়ে যেসব সংস্থা কাজ করে, তারা আন্তরিক নয়। নানা অজুহাতে তারা প্রচলিত মাটি পোড়ানো ইটের প্রতিই বেশি আগ্রহী। বর্তমানে সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ। এখনও ইটের ব্যবহারই বেশি। অথচ কথা ছিল, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মধ্যে সরকারি প্রকল্পে শতভাগ ব্লক ব্যবহার করতে হবে। 

সমকাল: বেসরকারি আবাসন খাত কি ব্লকের দিকে ঝুঁকছে, নাকি তারা এখনও পোড়ামাটিতেই অভ্যস্ত?

জুলকর শাহীন: কিছু কিছু আবাসন ভবন নির্মাণে ব্লক ব্যবহার হচ্ছে। আবাসন খাতের বড় সংগঠন রিহ্যাব। তারা সাংগঠনিকভাবে বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও রিহ্যাবের কোনো কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠান ব্লক ব্যবহার করছে।

সমকাল: বর্তমানে আপনাদের উৎপাদন খরচ এবং বাজারে পোড়ামাটির ইটের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র কেমন?

জুলকর শাহীন: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি ব্লক খাতকে ভ্যাটমুক্ত রাখার অনুরোধ করা সত্ত্বেও অজানা কারণে এ ব্যাপারে কোনো সুখবর আজ পর্যন্ত ব্লক শিল্প পায়নি। বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ নীতিমালায় ব্লকের ওপর ভ্যাট ও আমদানি করা কাঁচামালের শুল্ক পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তের কথা বলা আছে।

সমকাল: ব্যাংক ঋণ পেতে আপনারা কোনো ধরনের সমস্যায় পড়ছেন? 

জুলকর শাহীন: একটি মানসম্মত স্বয়ংক্রিয় ব্লক কারখানা স্থাপন করতে ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হয়। কিন্তু ঋণ পেতে বেশ জটিলতার মুখে পড়তে হয়। নানা প্রতিবন্ধকতায় আমাদের ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছে না। ব্লক শিল্প সবুজ অর্থায়নের দাবিদার হলেও নানা জটিলতার কারণে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবুজ অর্থায়নের ঋণ পায়নি। 

সমকাল: ফ্লাই অ্যাশ, স্লাগ বা অপচয়জাত কাঁচামাল দিয়ে ব্লক তৈরির মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছেন কীভাবে?

জুলকর শাহীন: ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্টেরও একটি কাঁচামাল। স্লাগ মূলত রড ফ্যাক্টরি থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা মূলত পাথরের চেয়েও মজবুত। এ ছাড়া পাথরের গুঁড়া, সিমেন্ট ও বালু ব্লক তৈরির কাঁচামাল। এসব উপকরণ নির্দিষ্ট অনুপাতে আধুনিক মেশিনে সংমিশ্রণ ও উচ্চ চাপে ব্লক তৈরি করা হয়। ফলে এর মান ও স্থায়িত্ব নির্ভরযোগ্য। তবে ব্যক্তিশ্রেণির গ্রাহকদের হাতে-কলমে প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজি করাতে হয়। কোনো কোনো সময় এ বিষয়টা বেশ কষ্টকর হয়। 

সমকাল: মান নির্ধারণ পদ্ধতি কি আপনাদের ব্যবসার অনুকূলে, নাকি প্রক্রিয়াগত কোনো জটিলতা আছে?

জুলকর শাহীন: কিছু জটিলতা থাকলেও মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থাকা জরুরি। বিএসটিআইর পক্ষ থেকে ব্লকের একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আমার জানামতে, দেশের বেশির ভাগ বড় ও মাঝারি ব্লক কারখানা বিএসটিআই থেকে মান সনদ গ্রহণ করেছে। তবে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান মান সনদ ও মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া উৎপাদন করে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে এই শিল্পের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করি। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) ব্লক শিল্প এবং ব্লকের মানোন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা করে থাকে। ব্লকের বাজার তৈরিতে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ ছাড়া ব্লক কারখানাগুলোকে স্বল্প মূল্যে মান পরীক্ষা করার সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

সমকাল: রাজমিস্ত্রি ও কারিগরদের ব্লক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও অভ্যস্ততার অভাবকে কতটা বড় বাধা মনে করেন?

জুলকর শাহীন: এটা একটা বড় বাধা বলে মনে করি। এই যুগেও অনেক বাড়ি নির্মাতা রাজমিস্ত্রির পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। তারা এখনও পোড়া ইটের প্রতি আস্থাশীল। ব্লক যে দীর্ঘস্থায়ী ও সাশ্রয়ী এটা অনেকেই জানেন না। যদিও কিছু বড় ব্লক প্রস্তুতকারক ও এইচবিআরআই রাজমিস্ত্রি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।

সমকাল: বাজারে নিম্নমানের ব্লকের উপস্থিতি রোধে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

জুলকর শাহীন: এমনিতেই ব্লকের ব্যবহার কম। এর মধ্যে মানহীন ব্লক তৈরি হলে, অর্থাৎ গ্রাহক আস্থা হারালে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্নমানের ব্লক উৎপাদন রোধে নজরদারি ব্যবস্থা খুব বেশি নেই বললেই চলে। এ ব্যাপারে আন্তরিক না হলে মানহীন ব্লকের ব্যবহার যেমন গ্রাহকের ক্ষতিসাধন করবে, তেমনি দীর্ঘ মেয়াদে এই শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

সমকাল: পোড়ামাটির ইট পুরোপুরি বন্ধ করে শতভাগ ব্লকে রূপান্তরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের কাছে আপনার মূল দাবি বা প্রত্যাশা কী?

জুলকর শাহীন: মূল দাবি, এক কথায় বলা যায়, নীতি সহায়তা। পোড়ামাটির ইটের ওপর বর্তমানে প্রতি হাজার ইটে ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারিত রয়েছে। তবে বেশির ভাগ ইটভাটা বার্ষিক থোক বরাদ্দ হিসেবে তিন-চার লাখ টাকা ভ্যাট দিয়ে থাকে। যদিও মাঝারি মানের একটি ইটভাটা বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইট উৎপাদন করে। অন্যদিকে, হলো ব্লক ছাড়া অন্যান্য ব্লক উৎপাদনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারিত। একই কাঁচামাল ও মেশিন ব্যবহার করে কিছু পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ আবার কিছু পণ্যের ভ্যাটমুক্ত। এটা একটা জটিলতা। আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে মাটি পোড়ানো ইটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাও এক রকম দুরূহ। তাই আমাদের দাবি, অতি দ্রুত ভ্যাট জটিলতা দূর করে এবং নতুন মানসম্মত ব্লক কারখানা প্রতিষ্ঠায় স্বল্প সুদে মূলধন জোগান দিয়ে এই শিল্পের অগ্রগতির পথ সুগম করা হোক।

 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন বাদল

আরও পড়ুন

×