বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয়করের হিসাব যেভাবে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, তেমনি রাজস্ব আয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত করার সময় অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। সঠিক নিয়ম জানা থাকলে যে কেউ সহজে নিজের আয়কর নিজে হিসাব করতে পারেন।
আয়কর হিসাব করার ক্ষেত্রে আয়ের উৎস যা-ই হোক না কেন, রিটার্নে তা উল্লেখ করতে হবে। কিছু আয়ের ক্ষেত্রে সরকার কর রেয়াত সুবিধা দিয়ে থাকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চাকরি থেকে মোট প্রাপ্তিকে প্রথমে যোগ করতে হয়। একজন কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব সুবিধা পান, যেমন–মাসিক মূল বেতন, উৎসব বোনাস, চিকিৎসা ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, বাড়ি ভাড়া ভাতা, গাড়ি সুবিধাসহ সবকিছুই চাকরি খাতের মোট প্রাপ্তির অন্তর্ভুক্ত হয়।
আয়কর বিধিমালা অনুযায়ী, যে কোনো বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য বিশেষ করছাড় রয়েছে। চাকরি থেকে আয়বর্ষে পাওয়া মোট অর্থের এক-তৃতীয়াংশ অথবা সর্বমোট পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে যা কম, সেই পরিমাণ অর্থ করমুক্ত হিসেবে মোট প্রাপ্তি থেকে বাদ যাবে। অবশিষ্ট অর্থ ব্যক্তির চাকরি খাতের নিট করযোগ্য আয় হবে।
উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, এবিসি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন করদাতা মাসিক ৫২ হাজার ৫০০ টাকা হারে মোট ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এর পাশাপাশি দুটি উৎসব বোনাস বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, বছরে ৬০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ১৮ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা এবং ৩ লাখ টাকা বাড়ি ভাড়া ভাতা পান। এ ছাড়া অফিস থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ১৫০০ সিসির গাড়ি বরাদ্দ পাওয়ায় বার্ষিক ৬০ হাজার টাকা গাড়ি সুবিধা হিসেবে যোগ হয়। ফলে চাকরি খাত থেকে তাঁর মোট প্রাপ্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
এখন করছাড়ের নিয়ম প্রয়োগ করলে দেখা যায়, ১১ লাখ ৭৩ হাজার টাকার এক-তৃতীয়াংশ হয় ৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। যেহেতু ৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা পাঁচ লাখ টাকার চেয়ে কম, তাই এই ৩ লাখ ৯১ হাজার টাকাই করমুক্ত হিসেবে বাদ যাবে। ফলে চাকরি থেকে নিট করযোগ্য আয় দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
চাকরি খাতের বাইরেও ব্যক্তির অন্যান্য উৎস থেকে আয় থাকতে পারে। যেমন– এই করদাতার বাড়ি ভাড়া থেকে করযোগ্য আয় রয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং কৃষি খাতে আয় রয়েছে ৬০ হাজার টাকা। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ থেকে লভ্যাংশ বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে আমানত রাখা অর্থের পর সুদের আয় পেয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। সবকটি খাতের করযোগ্য আয় যোগ করলে ওই আয়বর্ষে তাঁর সর্বমোট করযোগ্য আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
আয়করের ধাপ অনুযায়ী কর হিসাবের ক্ষেত্রে নারী করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা বিদ্যমান। সাধারণ পুরুষ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকা হলেও নারী করদাতাদের জন্য এই সীমা চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। ধরি, এ করদাতা একজন নারী। তাহলে তাঁর করযোগ্য ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা মোট আয়ের প্রথম ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপর কোনো কর দিতে হবে না। পরবর্তী তিন লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা এবং তার পরবর্তী চার লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ৬০ হাজার টাকা কর ধার্য হয়। অবশিষ্ট ৮২ হাজার টাকার ওপর ২০ শতাংশ হারে কর আসে ১৬ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ কর রেয়াত বিবেচনার পূর্বে তাঁর মোট করদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ৪০০ টাকা।
করদাতা অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াতের সুফল পান। যেমন এই নারী করদাতা সঞ্চয়পত্রে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন এবং জীবন বীমার প্রিমিয়াম বাবদ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ১০ শতাংশ হারে তাঁর অনুমোদিত কর রেয়াতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১ হাজার টাকা। এই রেয়াত বাদ দেওয়ার পর তাঁর প্রদেয় করের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়ে হয় ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা।
এবার আসা যাক চূড়ান্ত প্রদেয় করের হিসাবে। করবর্ষে তাঁর ব্যাংক সুদের ওপর উৎসে ১১ হাজার টাকা এবং লভ্যাংশের ওপর ১৫ হাজার টাকা কর কর্তন করা হয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর বেতন থেকে প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই ৩৬ হাজার টাকা উৎসে অগ্রিম কর হিসেবে কর্তন করে রেখেছিল। ফলে মোট ৬২ হাজার টাকা উৎসে কর্তিত কর সমন্বয় করার পর সরকারের কাছে তাঁর নিট প্রদেয় আয়করের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪০০ টাকা। উল্লেখ্য, করদাতার নিট সম্পদ ২০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে তাঁর মোট আয়করের ওপর ৩০ শতাংশ সারচার্জ যুক্ত হয়।
সঠিক কাগজপত্র সংরক্ষণ ও করছাড়ের নিয়ম জানা থাকলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সহজেই আয়কর হিসাব করতে পারেন। আয়করের নিয়ম মেনে চললে আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের পাশাপাশি করদাতারা সব সুবিধা গ্রহণ করে নিশ্চিন্তে রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
করদাতাদের নিজেই নিজের আয়কর সহজে যাতে হিসাব করতে পারেন, তার জন্য প্রতিবছর ‘আয়কর নির্দেশিকা’ নামে একটি বই প্রকাশ হয়। এ বছরও হয়েছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে পাবলিকশনস অপশনে গিয়ে এর পিডিএফ ভার্সন ডাউনলোড করা বা পড়া যায়। এ নির্দেশিকাতে নানা উদাহরণ দিয়ে আয়কর হিসাবের পদ্ধতি বর্ণনা রয়েছে।
- বিষয় :
- আয়কর রিটার্ন