ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফার্মার স্কুলে বদলে যাচ্ছে চাষাবাদ

ফার্মার স্কুলে বদলে যাচ্ছে চাষাবাদ
×

আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছেন কৃষক। প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষকেরা বাড়াচ্ছেন ফলন ও আয়। রাজশাহীর চারঘাট থেকে সম্প্রতি তোলা ছবি সমকাল

জাহিদুর রহমান 

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর চারঘাটে মো. আশরাফুল ইসলামের ১০ কাঠা জমিজুড়ে এখন বেগুনের সমারোহ। তিন মাসে এই ছোট্ট জমি থেকে বেগুন বিক্রি করে ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন তিনি। কয়েক দিন পরপর ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে বাজারে পাঠাচ্ছেন। তাঁর কাছে এই জমি এখন শুধু ফসলের ক্ষেত নয়, পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
আশরাফুল বলেন, ‘আগে নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী চাষ করতাম। এখন কখন কী করতে হবে, কীভাবে গাছের পরিচর্যা করতে হবে এবং রোগবালাই সামলাতে হবে–এসব বুঝে কাজ করি। অল্প জমি থেকেও যে ভালো আয় সম্ভব, সেটি এখন নিজের জীবনেই দেখছি।’
আশরাফুলের পাশের ক্ষেতেই ওয়াশিউর রহমানের সাড়ে পাঁচ বিঘা বেগুনের জমি। গত তিন মাসে তাঁর আয় হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। সামনে একই জমি থেকে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার বেগুন বিক্রির আশা করছেন তিনি।
বেগুনেই থেমে নেই চারঘাটের কৃষকরা। শীতকালীন আগাম সবজি চাষেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। আশরাফুল ও সুমন মিলে ছয় বিঘা জমিতে পাতাকপি লাগিয়েছেন। আগামী তিন মাসে সেখান থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা তাদের। পাশাপাশি দেড় বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছেন, যা ৪০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় এনে দিতে পারে। আশরাফুলসহ এলাকার আরও কৃষক এখন আগাম সবজি চাষে ঝুঁকছেন।
চারঘাটের কৃষকদের এই আর্থিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ফার্মার স্কুল’। এটি সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের সাসটেইনেবিলিটি উদ্যোগ, যা কৃষকদের জন্য একটি সমন্বিত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। চারঘাটের ১৪টি গ্রামের দেড় হাজারের বেশি কৃষক এই স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এখানে ফসল উৎপাদন ও পরিচর্যা, মাটির স্বাস্থ্য, বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষি উপকরণের দায়িত্বশীল ব্যবহারসহ কৃষকের প্রয়োজনভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ রয়েছে। 
সিনজেনটা বাংলাদেশের  পরিচালক, করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এবং সাসটেইনেবিলিটি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই স্কুল ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এখানে কৃষকরা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৃষিবিষয়ক সমাধান পাচ্ছেন, শিখছেন আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতি। এলাকার কৃষকদের ফলন বৃদ্ধি এরই প্রতিফলন। ‘ফার্মার স্কুল’ কৃষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে; যা মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিচ্ছে, প্রযুক্তি হস্তান্তরকে সহজ করছে এবং ভবিষ্যতে কৃষকদের আরও দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উদ্ভাবনী কৃষিচর্চায় অনুপ্রাণিত করবে। একই সঙ্গে কৃষকদের সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম ডেভেলপমেন্টের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ফার্মার স্কুল।  
চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, কৃষিকে লাভজনক করতে উৎপাদনের পাশাপাশি সঠিক ফসল নির্বাচন, খরচ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সম্পর্কে ধারণা জরুরি। কৃষকরা শেখা বিষয় মাঠে প্রয়োগ করে যখন ভালো ফলন ও আয় পাচ্ছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তনে পিছিয়ে নেই নারীরাও। ফার্মার স্কুলে যুক্ত নারী কৃষকরা সবজি উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবারের কৃষি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আরও সক্রিয় হচ্ছেন। নারী কৃষক রোকসানা খাতুন বলেন, নিজে আয় করতে পারলে একজন নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে, পরিবারেও তাঁর মতামতের গুরুত্ব বাড়ে। কৃষি আমাদের সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×