পথিকৃৎ
নূরজাহান বেগম
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০২:২৮ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০২:২৮
যে কোনো দেশ বা জাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সাময়িকপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রই সেই জাতির রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, লোকাচার তথা জাতিসত্তার স্বকীয় সব ক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট সমকালীন চিন্তাচেতনাকে ধারণ করে। অর্থাৎ সাময়িকপত্র হচ্ছে ইতিহাসের উপাদান জোগানদার।
‘বেগম পত্রিকায় মুসলিম নারীর সমাজ সংস্কৃতি চিন্তা’ শীর্ষক এক গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আফরোজা বুলবুল লিখেছেন, ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই রবিবার কলকাতা থেকে বাংলা ভাষায় মহিলাদের প্রথম সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ প্রকাশিত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘বেগম’ ছিল বাংলা ভাষায় একজন মুসলিম পরিচালিত প্রথম সচিত্র মাসিকপত্র, ‘সওগাত’ (১৯১৮) সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের উদারনৈতিক এবং প্রগতিশীল চিন্তার ফসল। রাজনৈতিক কর্ম প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নারী-পুরুষ সমান অধিকারের প্রতি একটি উদারপন্থি পত্রিকা হিসেবে ‘বেগম’ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মহিলাদের সমান অধিকার দানের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে ‘বেগম’। স্বাগত বক্তব্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে এই বলে যে আমরা এ যুগে বাস করছি এবং যে দ্রুত উন্নয়ন অভিযানের মধ্য দিয়ে উত্তরোত্তর এগিয়ে চলার প্রয়াস পাচ্ছি, তাতে পৃথিবীর মোট জনগণের অর্ধেক নারীসমাজকে সামান্যতম অধিকার থেকেও দূরে সরিয়ে রাখা চলে না। অথচ বর্তমান বিশ্বের বহু অঞ্চলে নারী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার জীবনে অধিকার বঞ্চিতা। জাতিসংঘের নয়া উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা সমাধানের পথকে সহজ করেছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকাটির আবির্ভাব ও পথচলা– পুরোটাই ছিল বাঙালি মুসলিম নারীর উৎকর্ষ সাধনকে ত্বরান্বিত করার মানসে। অশিক্ষা-অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নারীকে নিয়ে আসা, গৃহকোণের অন্ধকার কুঠুরি থেকে বাইরের কর্ম পরিবেশের আভাস দেয়া– এই লক্ষ্যে পরিচালিত ‘বেগম’-এর সার্বিক প্রচেষ্টা ছিল তার পাঠককে বিষয় বা কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করানো। লেখক আহমাদ ইশতিয়াকের মতে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থেকে সম্পাদনা সবই যাত্রা শুরু করেছিল তাঁর হাত ধরে। বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম। তাঁর সম্পাদিত বেগম পত্রিকা ছিল প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক। যে পত্রিকায় নূরজাহান বেগম তাঁর সম্পাদনায় তুলে আনলেন নারী জাগরণ, নারী স্বাধীনতা থেকে নারী অধিকার। যেখানে উঠে এসেছিল কুসংস্কার বিলোপের কথা, গ্রামগঞ্জের নির্যাতিত নারীদের চিত্র, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জীবনবোধ থেকে লেখা চিঠিও। প্রকৃত নারী অর্থেই বেগম ছিল নারী প্রগতি, স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে অদম্য এক মাধ্যম। বেগম পত্রিকার মধ্য দিয়ে সর্বমহলের নারীর ভাষ্য তুলে এনেছিলেন নূরজাহান বেগম। তাঁর দেখাদেখি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে নারী স্বাধীনতার পথ বিস্তৃত হয়েছিল। বেগম পত্রিকায় লেখনী ও পাঠের মধ্য দিয়ে নারীরা নিজেদের অধিকারের বিষয়ে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের নারীদের সাংবাদিকতায় আসার সুযোগ হয়েছিল। নূরজাহান বেগমের জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে। তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল অবশ্য পাইকারদী গ্রামে। কিন্তু সেই গ্রাম মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলে তাঁর বাবা চালিতাতলীতে বাড়ি করেন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বিখ্যাত সওগাত পত্রিকার সম্পাদক। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
