ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দিশেহারা স্বজনের জীবনযুদ্ধ

দিশেহারা স্বজনের জীবনযুদ্ধ
×

কামাল মিয়া, মো. রিপন

 ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলত কামাল মিয়ার। অভাব-অনটন থাকলেও সন্তানদের জন্য তিনি ছিলেন দিলদরিয়া। মেয়ে খাতা কেনার জন্য ১০০ টাকা চাইলে ৫০০ টাকা দিতেন। সেই মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা এখন দিশেহারা। সংসার সামলানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন কামালের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর পল্টনের বটতলা গলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান কামাল। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা সমকালকে জানান, সংসারের পুরো দায়িত্ব পালন করতেন কামাল। অর্থকষ্ট থাকলেও সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। তখন ফাতেমা অনেকটাই নির্ভার ছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর কাঁধেই সব। স্বামী শহীদ হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেয়েছেন, কিন্তু তা দিয়ে সব খরচ মেটানো যায় না। রাজধানীর শান্তিনগরে ভাড়া বাসায় থাকেন। সেখানকার ভাড়া ১৫ হাজার টাকা; গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ মিলিয়ে সেটি দাঁড়ায় ১৯ হাজার টাকা। দুই মেয়ে ও এক ছেলে পড়ালেখা করছে। তাদের পেছনেও খরচ আছে। তাই তিনি একটি সরকারি দপ্তরে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ নিয়েছিলেন। সম্প্রতি সেখান থেকে তাঁকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব সংকট ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি অভাব বোধ করেন নির্ভর করার মতো একটা মানুষের, যিনি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই চলে গেছেন চিরতরে।

ফাতেমা বলেন, ‘মানুষটা মইরা যাওয়ার দুই বচ্ছর হয়ে গেল; এখনও প্রত্যেক রাতে একা একা কাঁন্দি আর ভাবি, আমার কপালডা এত্ত খারাপ ক্যান। স্বামী হারাইলাম, বাচ্চাগুলা বাপেরে পাইল না। এখন আমি অগো বাপ, আমিই অগো মা। কিন্তু যতই চেষ্টা করি, বাপের অভাব কি পূরণ হয়? কিছু কম-বেশি হইলেই কয়, আব্বু থাকলে এমন হইত না। আব্বু থাকলে না করত না। আব্বু কখনও আমাদের কষ্ট দেয় নাই।’

কামাল-ফাতেমা দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে আনিকা আক্তারের বিয়ে হয়েছে। মেজো মেয়ে সুরভী আক্তার (১৮) মাদ্রাসায়, ছোট মেয়ে সুরাইয়া আক্তার (১৭) স্কুলে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে ইয়াছিন মিয়া (১২) মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে পড়ে। সন্তান হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেননি কামালের মা রওশন আরা বেগম। তিনি এখনও শয্যাশায়ী। তাঁর চিকিৎসা ও দেখাশোনাও করতে হয় ফাতেমার। একই বাসায় তারা থাকেন। ফাতেমা জানান, কামালের মৃত্যুর পর নিজের চেষ্টায় একটি চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা জানিয়ে দিয়েছে, আগস্ট থেকে তাঁকে আর দরকার নেই। এতে আবারও দুর্ভাবনায় পড়েছেন। চাকরি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। 

‘আব্বু আমাকে খুব আদর করত’
‘আব্বু আমাকে খুব আদর করত। প্রতিবার ঢাকা থেকে আসার সময় কিছু একটা নিয়ে আসত। আব্বুর কথা খুব মনে পড়ে। আমরা তো এখন খালার সঙ্গে থাকি; যখন দেখি খালু তাঁর মেয়েকে আদর করতেছে, তখন আমার কান্না চলে আসে। খুব মন খারাপ হয়। আব্বুর আদর আর কখনও পাব না।’ কথা বলতে বলতে কান্নায় গলা ভারী হয়ে আসে কিশোরী সানজিদা আক্তার ঊর্মির। সে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ রিকশাচালক মো. রিপনের মেয়ে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুরান ঢাকার কোতোয়ালি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন রিপন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার রুমা মামলা করেন। দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে রুমা এখন চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দক্ষিণ শিকলবাহা এলাকার চরহাজারী আদর্শপাড়ায় থাকেন। তাঁর আট বছরের ছেলে রফিকুল ইসলাম তুহিনের কথা বলায় জড়তা রয়েছে। বয়সের তুলনায় মানসিক বিকাশেও পিছিয়ে থাকা ছেলেটি এখনও বুঝতে পারে না তার বাবা নেই। তাই প্রায়ই সে জানতে চায়, আব্বু কই?

শামীমা আক্তার রুমা সমকালকে জানান, রিপন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে যা উপার্জন করতেন, তা দিয়েই চলত সংসার। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে মারাত্মক বিপদে পড়ে পরিবার। তবে পরে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেয়ে এখন তারা কিছুটা ভালো আছেন। সরকারি সহায়তার টাকা দিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় একখণ্ড জমি কিনেছেন। যদিও ঘর তুলতে পারেননি। আপাতত বোনের বাড়িতে থাকেন তারা। কিছু টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করেছেন। আর তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নিয়েছেন। তাঁর ১৫ বছরের মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলেকে ভর্তি করে দিয়েছেন একটি মাদ্রাসায়। মানসিক বিকাশের জন্য চিকিৎসক তাকে অন্য শিশুদের সঙ্গে স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। রুমা জানান, তুহিনকে প্রথম দিকে তার বাবার মৃত্যুর কথা বলা হয়নি। পরে বলা হলেও বিষয়টি সে বুঝে উঠতে পারছে না। রিপন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরের সময়ের একটি ভিডিও পেয়েছেন তারা। 

আরও পড়ুন

×