নজরুলসংগীতে দুর্গার সত্তার স্বরূপ
সম্পা দাস
সম্পা দাস
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুর্গোৎসবের আনন্দমুখর আহ্বানে যখন স্বর্গ, মর্ত্য অন্তরীক্ষে দেবীবন্দনার সুর অনুরণিত হয়, তখনই কাজী নজরুল ইসলামের ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়’ গানটির একটি পঙ্ক্তি আমাদের খানিক থামিয়ে দেয়– ‘মৃন্ময়ী রূপ তোর পূজি শ্রী দুর্গা তাই দুর্গতি কাটিল না হায়’। কেন বললেন নজরুল এমন কথা?
তাঁর আরেকটি সংগীত ‘ওমা দনুজ-দলনী মহাশক্তি নমো অনন্ত কল্যাণ-দাত্রী (নমো)’। এ গানটিতে দুর্গাকে ‘অনন্ত কল্যাণ দাত্রী, ‘পরমেশ্বরী’, ‘মহিষ-মর্দিনী’, ‘বিশ্ব-বিধাত্রী’– এসব সম্বোধনে যে গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদন প্রকাশিত, তা ক্রমে মানুষের দীনতা, ভীরুতা ও গ্লানি অতিক্রম করবার প্রয়াসে এক আকুলতায় রূপ নেয়। অন্য পঙ্ক্তিতে ‘রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও’– এই প্রার্থনায় মায়ের কাছে কবি শুধু নিজের মুক্তি চান না; মানুষের ভেতরকার সাহস, আত্মমর্যাদা ও কল্যাণবোধ জাগিয়ে তোলার শক্তিও প্রত্যাশা করেন। দুর্গার স্নেহময়ী সত্তা ও দুর্জয় শক্তি যেন এখানে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। মাতৃভক্তির অন্তঃসলিলা এভাবেই মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য, আনন্দ-বেদনা দূরীভূত হয়ে মানুষের সাথে মানুষের হিংসা-বিদ্বেষ মোচনের বৃহত্তর প্রত্যয়ে এসে মিশে গেছে।
সাধারণত কাজী নজরুলকে দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সুরের কবি, মানুষের কবি ইত্যাদি নানা অভিধায় চিহ্নিত করে থাকি। বাস্তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতা এতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন, যুক্ত হয়েছিলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে। তাই কেবল সুরাশ্রয়ী উচ্চারণ নয়, তাঁর গানের প্রতিটি শব্দ যেন লক্ষ্যভেদী বুলেট, অর্থের ভারে বিদ্ধ চেতনাকে আলোড়িত করার অসামান্য ক্ষমতায় দীপ্ত। কোথাও তা প্রতিবাদের তীব্র উচ্চারণ, কোথাও আত্মমর্যাদার জাগরণ, আবার কোথাও গভীর মমতা ও মানবিকতার স্নিগ্ধ প্রকাশ। বাণীর এই শক্তি, ব্যঞ্জনার এই গভীরতা এবং সুরের সঙ্গে শব্দের এমন সৃজনশীল সমন্বয়েই নজরুলের সংগীত স্বতন্ত্র মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর দুর্গাসংগীতেও উজ্জ্বল– ভক্তি ও শক্তির সমন্বয়ে উন্মোচিত হয় মানবিক দর্শনের এক দিগন্ত।
‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়’ গানটিতে ভক্তহৃদয়ের এক গভীর আকুলতা যেন সুরে সুরে মায়ের কাছে নিবেদিত হচ্ছে। ‘যে মহা-শক্তির হয়, হয় না বিসর্জন অন্তরে বাহিরে প্রকাশ যার অনুখন’–পঙ্ক্তির দুটিতে দেবী দুর্গার চিরন্তন উপস্থিতির এক অপূর্ব অনুভব জেগে ওঠে। তিনি কেবল মন্দিরে পূজিত দেবী নন, ভক্তের অন্তরে জেগে থাকা বিশ্বাস, নির্ভরতা ও শক্তিরও উৎস। সেই অনুভবই নজরুল যখন বলেন ‘মন্দিরে দুর্গে রহে না যে বন্দী’, সে দুর্গারে দেশ চায়, তখন মায়ের প্রতি তাঁর নিবেদন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশের জন্য এক মমতাময় প্রার্থনায়। যে মায়ের চরণে ভক্তের আত্মসমর্পণ, সেই মায়ের শক্তিতেই তিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণ দেখতে চান। ‘আমাদের দ্বিভুজে দশভুজা শক্তি দে পরম ব্রক্ষময়ী’ শক্তি পূজার ভক্তি কি পাব শুধু হবো না কি বিশ্বজয়ী’– এই আকুল প্রার্থনায় তাই মিশে থাকে বিনয় ভক্তি আর মায়ের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার সাধ।
দুর্গাসংগীতের চিত্রকল্প নির্মাণের প্রয়াসে নজরুল বাণীভাবের সঙ্গে সুর নির্মাণেও যথাযথ রাগের প্রয়োগ করেছেন। ‘রাগেশ্রী’ রাগের আবহে বাণী ও সুরের মেলবন্ধন ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়’– গানটির অনুভবকে নিবিড়-গভীর করে তোলে। গানটি যখন শ্রোতা শোনে তখন মনে হয়, দেবীর উদ্দেশে উচ্চারিত কয়টি কথা নয়– এ যেন হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের, মানুষের সঙ্গে তাঁর আরাধ্য শক্তির এক নীরব সংযোগ। এই যে ভক্তির আবেশ, তারই গভীরে থাকে মানুষের মঙ্গলকামনা। মায়ের কাছে নিবেদিত হৃদয় তাই শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষের কাছে, দেশের কাছে– ভালোবাসা ও কল্যাণের এক অখণ্ড অনুভব নিয়ে।
নজরুলের দুর্গাসংগীতে শক্তি ও কল্যাণের জন্য যে আকুল প্রার্থনা তার তাৎপর্য আজকের সমাজ বাস্তবতায়ও গভীরভাবে অনুভব করা যায়। অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও মূল্যবোধের সংকট আজ মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বাড়িয়ে তুলেছে; ব্যক্তিজীবন থেকে বৃহত্তর সমাজ– সর্বত্রই জমছে নানা ক্ষত। এমন সময়ে দুর্গার শক্তিচেতনা কেবল অশুভের বিনাশ কামনা নয়। মানুষের অন্তরের বিবেক, সহমর্মিতা ও সাহস জাগিয়ে তোলার ও প্রেরণা। যে শক্তি ভীরুতা কাটায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, ভিন্নমতকে মর্যাদা দিতে এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে, আজ আমাদের প্রয়োজন সেই শক্তি। নজরুলের দুর্গাসংগীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়– মানবিক উত্তরণ শুরু হয় নিজের অন্তর থেকে, আর পূর্ণতা আসে মানুষের কল্যাণে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে। দেবীর আরাধনা তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর মঙ্গলময় আহ্বান ব্যক্তি ও সমাজের সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ ও উদাসীনতা অতিক্রম করে ভালোবাসা, সাম্য ও সহমর্মিতার পথ নির্মাণে প্রেরণা জোগায়।
‘মাতল গগন অঙ্গনে ঐ আমার রর্ণ রঙ্গিনী মা’– নজরুলের এই সুরময় উচ্চারণে যেন জেগে ওঠে শক্তিময়ী মায়ের অপরূপ মহিমা। তাঁর দুর্গাসংগীতে মায়ের প্রতি গভীর ভক্তি, স্নেহময় আশ্রয়ের আকুলতা আর দুর্জয় শক্তির বন্দনা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য অনুভবলোক। দুর্গোৎসবের আনন্দময় আবহ একসময় স্তিমিত হয়ে আসে, থেমে যায় পূজার আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু নজরুলের গানে জেগে থাকা মায়ের শক্তি ও করুণার সুর মানুষের অন্তর থেকে হারিয়ে যায় না। সেই সুর কখনও সাহস হয়ে জাগে, কখনও বিপন্ন মানুষের প্রতি মমতা হয়ে হৃদয়কে স্পর্শ করে, কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। দেবীর কাছে শক্তি চেয়ে কবি যেন মানুষের অন্তরেই জাগিয়ে দেন আত্মশক্তির দীপ– যার আলোয় মানুষ নিজের মর্যাদা উপলব্ধি করে, অন্যের দুঃখে সাড়া দেয়, ভালোবাসায় আপন করে নেয় সমগ্র মানবসমাজকে।
এভাবে নজরুলের দুর্গাসংগীত পূজার নির্দিষ্ট সময় ও পরিসর ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে চিরকালীন এক আত্মিক আশ্রয়, যেখানে ভক্তির রস, শক্তির মহিমা ও মানবপ্রেমের ব্যঞ্জনা একাকার হয়ে থাকে। দেবী বন্দনায় সুর থেমে গেলেও তার অন্তর্নিহিত আহ্বান থামে না; তা মানুষের হৃদয়ে জীবনে ও কর্মে বয়ে চলে– মঙ্গল, সাহস, সাম্য ও ভালোবাসার অক্ষয় প্রেরণা হয়ে।
নজরুল গবেষক, শিক্ষক ও নজরুলসংগীত শিল্পী
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল