ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

শৈশবের বিস্ময় কি আজও অমলিন

শৈশবের বিস্ময় কি আজও অমলিন
×
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাদা পাঞ্জাবি গায়ে, মাথায় টুপি– দুর্গাপূজার মণ্ডপে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে এক কিশোর। কয়েক বছর আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি মনে করিয়ে দিয়েছিল, শিশুমনের বিস্ময়ের কাছে ধর্মের বিভাজন তুচ্ছ। কিন্তু বড় হতে হতে একদিন সেই শিশু জেনে যায়, কোনো উৎসবে আপন হয়ে দাঁড়াতে হয়, কোনো উৎসবের সঙ্গে তাঁর বিস্তর ব্যবধান। কিন্তু একই ভূখণ্ডের একই হাওয়া-মাটিতে বেড়ে ওঠা মানুষই তো মানুষের সবচেয়ে আপনজন। তবুও তাতে বহু স্তরের হিসেবের কাটাকুটি দাগ জন্মায়।  

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দু সম্প্রদায়কে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিংবা ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আন্দোলন কিংবা নির্বাচনের পর প্রতিশোধের লক্ষ্য হন সংখ্যালঘুরা। সেই ক্ষত আর শুকায় না। বাবরি মসজিদ ভাঙার জের ধরে নব্বইয়ের দশকে কয়েকবার এ উৎসব নিরাপত্তাহীনতা চূড়ান্ত রূপ দেখেছে। বিভিন্ন স্থানে তখন ধর্মীয় আচার পালনের জন্য শুধু ‘ঘটপূজা’ করতে হয়েছিল। তিন যুগ পরেও দুর্গাপূজা নিরুদ্বেগের উৎসব নয়।  

উন্নত বিশ্বে যখন ক্যান্সারের চিকিৎসায় জিন সম্পাদনা, মহাকাশ গবেষণা ও গভীর সমুদ্রের অজানা জগৎ অনুসন্ধানে কাজ করছে তখন বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষ পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। উপাসনালয়ের সামনে গরু জবাই করে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা চলছে।
এ বছরের জুলাইয়ে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬২টি; উপাসনালয়ের জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। এসব শুধু অপরাধের হিসাব নয়, মানুষের নিরাপত্তাহীনতারও দলিল। 

গান্ধীবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসেবক শৈলেশ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল সাহিত্য সাময়িকী ‘ত্রৈমাসিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মিজানুর রহমানের বাড়িতে বসে। শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখে কেউ আরও সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠেন, আবার দাঙ্গায় পরিবারের সদস্যদের হারানোর যন্ত্রণা কাউকে আরও অসাম্প্রদায়িক হওয়ার প্রেরণা দেয়।’ কথাটির তাৎপর্য গভীর। সহিংসতা শুধু ঘরবাড়ি কিংবা উপাসনালয় ধ্বংস করে না, মানুষের মনে এর অভিঘাত আরও দীর্ঘমেয়াদের। সেই ক্ষত থেকে কেউ ঘৃণার উত্তরাধিকার বহন করেন, কেউ উপলব্ধি করেন ঘৃণার ভয়াবহতা। এখানে সমাজ কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করে আমরা কোন বোধকে লালন করছি এর ওপর।

বাংলাদেশে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দুর্বল জবাবদিহির সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে গুজবের বিস্তার এবং বিচার। ২০২৩ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সোশিওলজি সাময়িকীতে একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ধর্মীয় উগ্রতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আইনি দুর্বলতা এবং অপরাধের দায়মুক্তি হচ্ছে গুজবনির্ভর সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সোশিওলজিক্যাল পারসপেকটিভস অব সোশ্যাল মিডিয়া, রিউমার অ্যান্ড অ্যাটাকস অন মাইনরিটিজ: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ শিরোনামের এই গবেষণাটি করা হয়েছে ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সঙ্গে গুজবের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে। ২০১৩ সালে পাবনার বনগ্রাম, ২০১৭ সালে রংপুরের ঠাকুরপাড়া এবং ২০২১ সালে দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লার ঘটনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহিংসতার পেছনে দেখা গেছে অনলাইন পোস্ট ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ।  

গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে। ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে লাইভ করে লোক জড়ো করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনি দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও র‍্যাবের তদন্তে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ মেলেনি। অভিযোগের প্রমাণ না থাকলেও ধর্মের নামে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা যায়! অথচ ধর্ম অবমাননা প্রমাণিত হলেও কাউকে হত্যার অধিকার কারও নেই।
গত ডিসেম্বরে নিহত দীপু দাসের পরিবারের কাছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব কেমন ছিল, তা আমরা শুধু অনুমান করতে পারি। দুর্গাপূজা ভালো হয়েছে কিনা, তার মাপকাঠি শুধু মণ্ডপের সংখ্যা, আলোকসজ্জা কিংবা ভাঙচুর না হওয়ার পরিসংখ্যান নয়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের লাঠি হাতে পাহারা দেওয়ার দৃশ্যও নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক সংখ্যাহীন হিসাব। আরেকটি প্রসঙ্গও উল্লেখ প্রয়োজন। পূজার সময় কোথাও কোথাও মাদক সেবন ও উন্মত্ত নৃত্য পূজার পবিত্রতা এবং আরাধনার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। উচ্চ শব্দে 
মাইক বাজানো নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদেরই অভিযোগ রয়েছে। 
এতে একটি সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের আচরণের দায় পুরো ধর্মের ওপর না পড়ে। বিস্মৃত হওয়া যাবে না সুস্থ, শুদ্ধ ও ঐতিহ্যনির্ভর পূজার্চনা অন্যকে বিরক্ত করে না।
মানুষের কান্না, ভালোবাসা কিংবা নিরাপদে ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ধর্মীয় পরিচয় মেনে আসে না। ধর্ম যা-ই হোক, আমরা জীবনের সব অনুভূতি প্রকাশ করি বাংলায়। বাংলা গদ্যের বিকাশে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান স্মরণীয়। এই ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস কোনো এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একার নয়। যে অনুভূতি মানুষকে মানুষের কাছে আনে, তাকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দেয়ালে আটকে রাখা কি সম্ভব?

ধর্মবিশ্বাসে কেউ বুদ্ধের অনুসারী, কেউ সাকার দেবদেবীর উপাসক, কেউ নিরাকারের আশ্রয়প্রার্থী। কিন্তু নিজের ধর্মের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা কখনও অন্যের ধর্মকে হেয় করতে শেখায় না। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি পরা ছবির সেই কিশোর এতদিনে আরও বড় হয়েছে। দেখা হলে জানতে চাইতাম, শৈশবের সেই বিস্ময় কি আজও অমলিন, নাকি বিভাজনের পাঠে তা মুছে গেছে? ঠাকুরগাঁওয়ের এবারের দুর্গাপূজায় পুতুল শোভাযাত্রা হয়েছে। শোভাযাত্রার বিষয় ছিল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আবেদন। একটি ভিডিওতে দেখলাম অনেক শিশু মুগ্ধ হয়ে দেখছে বাঁশ-খড় দিয়ে বানানো বণ্যপ্রাণীদের। সেসব শিশুর মুখে তাকিয়ে বোঝা গেল না তাদের ধর্মীয় পরিচয়। এসব আয়োজন আশা জাগায় মানুষের মিলনের পথ এখনও বন্ধ হয়নি। ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি কোনো এক ধর্মের সম্পত্তি নয়; একই ভূখণ্ডের মানুষের অভিন্ন উত্তরাধিকার; যা থেকে মানুষ কখনও পৃথক হতে 
পারে না। 

সহকারী সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×