বিজয়ী-বিজিতের সহাবস্থানের প্রেরণা
পূজা সেনগুপ্ত
পূজা সেনগুপ্ত
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটা সমাজে যখন যুদ্ধ হয়, তখন একপক্ষের শক্তি জয়ী হয় ঠিকই কিন্তু পরাজিত শক্তিকেও অগ্রাহ্য করা যায় না। কারণ এই পরাজিতরাও সমাজের একটা বিশাল অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। অনেকটা এই কারণেই আর্যদের বিজয়ও শুরুতে প্রতিষ্ঠা পায়নি। দুর্গাপূজার লোক ইতিহাসে আমরা সবসময় শুনি, দেবতাদের রাজা ইন্দ্র স্বর্গ জয় করেছেন, কিন্তু সেখানে থাকতে পারেননি। মহিষাসুর শিবের বর লাভ করে বারবার ত্রিভুবন জয় করে নিয়েছে বা আসলে পুনর্দখল নিয়েছে আর ইন্দ্রসহ সব দেবতা প্রাণভয়ে ব্রহ্মার কাছে ছুটে এসেছেন সমাধান পাওয়ার জন্য। আর্যরা অনুভব করতে পারে যে, এই অঞ্চলে রাজত্ব করতে চাইলে এখানকার মানুষের ওপর নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালিয়ে দেওয়া যাবে না, এখানের চলমান সংস্কৃতিকে মন থেকে গ্রহণ করতে হবে।
এই অঞ্চলের সমাজ মাতৃপ্রধান, তাই মাতৃরূপিনী মা দুর্গা যিনি আর্য অনার্য নির্বিশেষে সব শক্তির সম্মিলিত রূপে দশভূজা, যিনি এ অঞ্চলের আরাধ্য দেবতা শিবের জীবনসঙ্গী, যিনি এই অঞ্চলের মাতৃপ্রধান সমাজের নারী শক্তির প্রতিনিধি– তাঁর কাছেই পরাজিত হবে মহিষাসুর। এ ছাড়া আর্যরা নিজেদের দেবতা ব্রহ্মা আর বিষ্ণুকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার জন্য ‘যিনি ব্রহ্মা তিনিই শিব’, ‘যিনি বিষ্ণু তিনিই মহেশ্বর’ ইত্যাদি জনশ্রুতিরও প্রচলন করে। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, যুদ্ধে জিতে যাওয়ার পরও, আর্যদের এ দেশের মানুষের বহমান সংস্কৃতির স্রোত ও নারীশক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল। আর এখানেই দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য, যা কালোত্তীর্ণ এবং আজকের বাংলাদেশেও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজকের বাংলাদেশে আবারও সরাসরি আমাদের জাতিসত্তার ওপর আঘাত এসেছে এবং সবচেয়ে বড় আক্রমণের মুখে পড়েছে আমাদের সংস্কৃতি ও নারী সমাজ। কিন্তু সংস্কৃতি বহমান নদীর ধারার মতো, এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে বা মেনে নিতে হবে। একটি ভূখণ্ডের সংস্কৃতিকে রাতারাতি আক্রমণ করে বদলে ফেলা সম্ভব না। সংস্কৃতি যে স্থির থাকে তাও কিন্তু না, সে তার নিজের মতো করে এগিয়ে যাবে। আমাদের সংস্কৃতিও আমাদের পদ্মার নদীর স্রোতের মতোই প্রবল শক্তিশালী এক জলধারা। জোর করে এর বাঁক পরিবর্তন করা অসম্ভব।
দুর্গাপূজার আরেক তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা হলো সহাবস্থান। যে সমাজে বিজয়ী শক্তি পরাজিত শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে, সেখানে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না, সবসময় যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকে। জয়পরাজয় আসলে শুধুই একটা মুহূর্ত, এর পরের মুহূর্তেই আমাদের এর ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে হয়, সহাবস্থানে ফিরে আসতে হয়, যিনি পরাজিত তাঁকেও স্থান করে দিতে হয়। তাহলেই সমাজে শান্তি ফিরে আসে আর জয়পরাজয়ের সেই একমাত্র মুহূর্তটা বিজয়ীর পক্ষে স্থায়ী হয়ে যায়। তখন সেই বিজয়ের গল্প শুধু ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ না থেকে ক্রমেই জনশ্রুতি থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গৌরব লাভ করে। যেমন কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে ‘মা দুর্গা ও মহিষাসুরের কাহিনি’। কারণ, এটা সূর-অসুরের দ্বন্দ্ব নয়, এটা পরাজিতকে নিজের সঙ্গে পূজিত হতে দেওয়ার এক বিজয়ী মায়ের উদার আখ্যান। দুর্গাপূজায় মা দুর্গার পাশাপাশি পূজিত হন মহিষাসুরও। এই সহাবস্থানই দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। একটা সমাজে নানা মত ও বিশ্বাসের মানুষ থাকবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে একে অপরকে সম্মান করতে না শিখলে সেই সমাজে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না, কোনো পক্ষের বিজয়ই স্থায়ী হবে না, সংঘাত চলতেই থাকতে।
আমাদের জীবনে মাটি আর মা মূলত এক। মায়ের মধ্যে আমরা মাটির শীতলতা পাই, আর মাটির কাছে পাই মায়ের স্নেহের মতো নির্ভরতা। তাই বাংলার মাটিতে মায়ের আরাধনা হবেই। একে থামানো যাবে না। এখানে যারা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তাদের অবশ্যই আমাদের সংস্কৃতি ও নারীশক্তির কাছে নত হতে হবে। মা প্রতি বছর আসবেন, পূজিত হবেন, উদযাপিত হবেন। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মা দুর্গার মূর্তি আবারও সেই মাটি আর জলের মধ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। এটা রূপ থেকে অরূপ হয়ে ওঠার এক অনন্য আখ্যান। এই দুর্গা শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এই শক্তি প্রতিমার রূপের সীমা ছাড়িয়ে জল ও মাটির সঙ্গে মিশে অরূপ হয়ে ওঠে। মাটির সন্তান হিসেবে আমরাও সেই শক্তির ভাগ পাই, মা দুর্গার শক্তিকে নিজের মাঝে আবিষ্কার করি বারবার– নতুন রূপে, নতুন উদ্যমে।
নৃত্যশিল্পী
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল