দুর্গাপূজার সেকাল-একাল
মিলন কান্তি দত্ত
মিলন কান্তি দত্ত
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সন্তোষ শর্মার ১৫ অক্টোবর ঢাকেশ্বরীতে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী এ বছর পূজা আরম্ভের পূর্বে ৩৪টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলেও বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা বা শারদ উৎসব উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে। এ বছর বাংলাদেশে ৩৩,৫৮১টি স্থায়ী-অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের থেকে ১,৫০০টি বেশি। বাংলাদেশের বাইরেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিন্দু সম্প্রদায় সাড়ম্বরে দুর্গাপূজা উদযাপন করছে। দেবী দুর্গা শাক্তদের কাছে সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবী; বৈষ্ণবের কাছে বিষ্ণুর অনন্তমায়া, শৈবের কাছে শিবের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গণ্য হলেও দুর্গা মূলত শক্তির দেবী। শাস্ত্রে রয়েছে–
‘ত্বমেব সূক্ষা স্থূলা ত্বং ব্যাক্তাব্যক্তস্বরূপিণী।
নিরাকারাপী সাকারা কন্তাং বেদিতুমর্হতি।।’
অর্থাৎ তুমিই আদ্যাশক্তি ভগবতী সূক্ষা ও স্থূলা, অব্যক্ত স্বরূপিণী, নিরাকার হয়েও সাকারা, তোমাকেই কে জানতে পারে। দেবী তাঁর স্বরূপ সম্পর্কে বলেন– ‘আমার রূপ নাই, জন্মও নাই, সকল বস্তুতে যিনি মাতৃরূপে বিরাজিতা, তিনিই বিশ্বজননী মা দুর্গা। দেবগণের সম্মিলিত তেজরাশি থেকে স্বরূপ ধারণ করা দেবী দুর্গা সমাজে নারীর মর্যাদা, শক্তি ও নেতৃত্বকে তুলে ধরেন।
উপমহাদেশে অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নামে দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে। ভারতের একাধিক স্থানে নবরাত্রি উৎসব হিসেবে আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ৯ দিনে দেবীকে ৯টি রূপে পূজা করা হয় এবং দশমী তিথিতে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শ্রীরামচন্দ্রের বিজয়কে স্মরণ করে ‘দশেরা’ বা ‘দশহরা’ হিসেবে পালিত হয়। বাঙালি হিন্দু সমাজ দশমী তিথিতে প্রতিমা নিরঞ্জনের পর ‘বিজয়া দশমী’ বা ‘শুভ বিজয়া’ হিসেবে পালন করে থাকে। কারণ এই দিনে দেবী দুর্গা ৯ দিন ৯ রাত টানা যুদ্ধ করে মহিষাসুরকে বধ করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, মেধা মুনির নির্দেশে রাজ্যহারা রাজা সুরথ রাজ্য ফেরত পাওয়ার আশায় দেবী দুর্গার সন্তুষ্টিলাভে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে প্রথম দুর্গাপূজা করেন, যা বাসন্তী দুর্গাপূজা বা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণে যে মেধা মুনির উল্লেখ আছে, অনেকের বিশ্বাস, সে মুনির আশ্রমের অবস্থান চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে, যেখানে রাজা সুরথ ও বাণিজ্যহারা সমাধি বৈশ্যের মেধা মুনির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। দেবীভাগবত বা কালিকাপুরাণে উল্লেখ আছে, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র সীতা উদ্ধারে রাবণ বধের উদ্দেশ্যে অকালে বোধন করে আশ্বিনের শুক্লা তিথিতে দুর্গাদেবীর পূজা করেন, যা শারদীয় দুর্গাপূজা হিসেবে অভিহিত। সময়ের বিবর্তনে বাসন্তিপূজার চাইতে শারদীয় দুর্গাপূজা হিন্দু সমাজে প্রাধান্য পেয়েছে।
বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে মতভিন্নতা থাকলেও যে জনশ্রুতি প্রাধান্য পেয়েছে তা হচ্ছে, রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ ১৫৮০ সালে মতান্তরে ১৫৮২ সালে বা ১৪৮০ সালে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। দুর্গাপূজা প্রথম দিকে ধনী ও জমিদার শ্রেণির পূজা হলেও ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু চাঁদা তুলে প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপূজার প্রচলন করেন, যা বারোয়ারী পূজা হিসেবে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
দুর্গাপূজার মূল দর্শন হচ্ছে অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির জাগরণ। এই পূজায় একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দিকটি প্রাধান্য পেলেও এর সামাজিক প্রভাব প্রণিধানযোগ্য। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’– এ চেতনাকে ধারণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পূজার উৎসবে সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ পরমতসহিষ্ণুতা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতির বন্ধন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে। হাজারো মানুষের মহামিলনে তৈরি হয় মহামিলনের পটভূমি। দুর্গাপূজার আর্থিক দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিমা থেকে শুরু করে স্থাপনা নির্মাণ, পূজার উপকরণ, পোশাক-আশাক, গহনা ক্রয়-বিক্রয়, মেলা ইত্যাদির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন নিঃসন্দেহে দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২১ সালের কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কো ‘মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ঐতিহ্যবাহী উৎসবের তালিকায় স্থান দেয়। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতির জন্য গর্ব বোধ করে।
দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু মাটির মূর্তিতে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। কয়েক দশক আগেও মাঝখানে সিংহবাহিনী দশভুজা দুর্গা, ডানপাশে লক্ষ্মী-গণেশ, বামপাশে সরস্বতী-কার্তিকেয়কে নিয়ে একচালায় দুর্গাপূজা করার যে ধারা প্রচলিত ছিল এবং দেবীকে মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীরূপে উপস্থাপনের যে রীতি মানা হতো; সময়ের বিবর্তনে থিম পূজার নামে বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে প্রতিমা নির্মাণসহ চিরায়ত দেবীরূপকে ক্ষুণ্ন করে এমন ভঙ্গিমায় প্রতিমা তৈরি করা হয়, যা সাত্ত্বিকভাবে পূজা করার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে। মণ্ডপ তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যের ব্যবহার মেনে নেওয়া গেলেও প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে ও শাস্ত্রীয় আচার পালনে সাত্ত্বিকতা বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য।
এককালে দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যথা ধর্মীয় পালাগান, পুথিপাঠ, নাটক, ইত্যাদি কালের গর্ভে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্গাপূজা করার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে বাহ্যিক আড়ম্বরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। যারা নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে শুদ্ধাচার ও পবিত্রতাকে নষ্ট করে তথাকথিত উৎসবে শামিল হন, তাদের বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী অসুর শক্তি সময়ে সময়ে মানবতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশকেও মাঝে মাঝে আসুরিক শক্তির মুখোমুখি হতে হয়। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত করে। মানুষের অন্তর্নিহিত দৈবসত্তার সঙ্গে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য– এই ষড়রিপুর যুদ্ধ সর্বদা চলছে। মহাশক্তি জগন্মাতার শরণাগত হয়ে ষড়রিপু থেকে মুক্তি লাভ করে দেবীসত্তার জাগরণ করতে পারলেই সার্থক হবে আমাদের দেবী দুর্গার আরাধনা।
সমাজকর্মী
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল