ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ইনান্না থেকে দুর্গা: পুরাণ পথে দীর্ঘ পরিক্রমা

ইনান্না থেকে দুর্গা: পুরাণ পথে দীর্ঘ পরিক্রমা
×
×

অদিতি ফাল্গুনী 

অদিতি ফাল্গুনী 

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বছর ঘুরে আবারও এসেছে দুর্গাপূজা। এমনিতেও দেবী দুর্গাকে নিয়ে প্রতিবছরই এ সময়টা সামাজিক মাধ্যমে হালে নানা আলোচনা হতে দেখা যায়। এই বাংলার অনার্য দেবী কালীর মতো তিনি নন কেন? কেন এই দেবী এতটা গৌরবর্ণা? তিনি কি অনার্য জনপদে বিজয়ী আর্য শক্তির প্রতিভূ? এমন নানা জল্পনা চলতেই থাকে। সারা পৃথিবীর পুরাণ নিয়েই আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে। তাই সুযোগ পেলেই পৃথিবীর নানা দেশে ও নানা সভ্যতায় সিংহবাহিনী দেবীর সমধর্মী উপাখ্যানের আলোচনা পড়ি ও লিখতে ভালো লাগে।
‘শক-হুন-দল-পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন’-এর এই উপমহাদেশে আজ আর্য-অনার্যের ততটা ভেদ খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও এটুকু বলাই যায়, সিংহবাহিনী দুর্গার মতো বেশ কজন দেবীকেই প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রাচীন গ্রিসে সিংহের পাহারায় সিংহাসনে উপবিষ্ট দেবী রিয়াহ, আনাতোলিয়ার সিংহবাহিনী দেবী ‘সিবিলি’ যাকে ফ্রিজিয়ান ভাষায় ‘মাউন্টেইন মাদার’ বলা হয় (দুর্গারও অন্য নাম যেমন পার্বতী), ব্যাবিলনের সিংহ পরিবেষ্টিতা দেবী ইশতার আর ব্যাবিলনের নিকটবর্তী অঞ্চল সুমেরিয়ার দেবী ইনান্না, মিসরের সিংহমুখো তবে মানবী দেহের শেখমেত... সিংহবাহিনী এত দেবীর পুরাণ কেন পাওয়া যাচ্ছে মানব সভ্যতায়?

ব্যাবিলনের ইশতারের মতোই সুমেরিয়ার 
দেবী ইনান্নার জীবনের এক করুণ সংগ্রামের কাহিনি খুব সংক্ষেপে লিখব এবং এ আখ্যান লিখতে গিয়েই আমাদের অঞ্চলের পুরাণের সঙ্গে গোটা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে কিছু বিস্ময়কর সাদৃশ্য পাওয়া যেতে পারে। 
১৯০০-১৬০০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে রচিত এক সুমেরীয় কবিতায় (ইনান্নার অবতরণ) স্বর্গের মহাদেবী ইনান্না সদ্যই বিধবা হওয়া তাঁর বোন এরেশকিগালকে সমবেদনা জানাতে পাতালে নামবেন। ইনান্না হলেন আকাশ বা স্বর্গ ও পৃথিবীর দেবী। তাঁর বড় বোন এরেশকিগাল পাতালের দেবী। কিন্তু অহঙ্কারী এরেশকিগাল এই ভেবে ভীত হয় যে, ছোট বোন হয়তো তাঁর পাতালের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে আসছেন। সুতরাং সাদর সম্ভাষণের বদলে জোটে বিরূপ অভ্যর্থনা । এই দীর্ঘ কবিতায় প্রথমেই বলা হচ্ছে, ‘মহান উচ্চতা থেকে দেবী কান পাতলেন অনন্ত নিচে।’ (ওল্কস্টেইন অ্যান্ড ক্রামার, ৫২)। এরপর বড় বোনকে সমবেদনা জানাতে ইনান্না তাঁর ভৃত্য ও পরামর্শক নিনশুবুরকে নিয়ে পাতালের দিকে চলেন। তিনি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরেছেন, মাথায় স্বর্গের মুকুট, গলায় দামি মালা, বক্ষে কবচ, আঙুলে স্বর্ণের আঙটি এবং হাতে রাজদণ্ড। ভৃত্য নিনশুবুরকে তিনি বলেন, কোনো কারণে পাতাল থেকে ফিরতে ব্যর্থ হলে কীভাবে নিনশুবুর তাঁকে সাহায্য করবে। এরপর পাতালের দরকায় ইনান্না করাঘাত করে, প্রবেশ করতে চাইলে  দ্বার-রক্ষক নেতি জানতে চাইল তিনি কে এবং এর উত্তরে ইনান্না যখন বললেন, ‘আমি ইনান্না, স্বর্গের রানী,’ নেতি জিজ্ঞাসা করলেন যে কেন ইনান্না এমন এক ভূমিতে যেতে যাচ্ছেন যেখান থেকে ‘কোনো পর্যটক আর ফিরতে পারে না।’ 
ইনান্না উত্তরে বললেন,
‘যেহেতু আমার অগ্রজা, এরেশকিগালের পতি
গুগালান্না, স্বর্গের বৃষ, দেহ রেখেছেন।
আমি তাঁর শেষকৃত্য দেখতে এসেছি।’ 
নেতি তখন ইনান্নাকে অপেক্ষা করতে বলে তাঁর অগ্রজা ও পাতালের দেবী এরেশকিগালের কাছে গিয়ে বোনের আসার সংবাদ জানালে খুশি হওয়ার পরিবর্তে পাতালের দেবী ‘তাঁর ঊরুতে চপেটাঘাত করলেন ও ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।’ নেতিকে তিনি বললেন, পাতালে প্রবেশের সাতটি দরজা আটকে দিতে এবং ইনান্নাকে যদি ঢুকতেই হয়, তবে একেকটি দরজায় তাঁর পরনের একেকটি পোশাক পরিত্যাগ করে তাঁকে আসতে হবে। 

নেতির নির্দেশ অমান্য করলেন না ইনান্না। পাতালের এক দ্বারে তিনি মাথার মুকুট খুললেন, আর এক দুয়ারে গলার মালা, পরের দরজায় হাতের আংটি, এক দরজায় হাতে দণ্ড এবং শেষমেশ তাঁকে খুলে ফেলতে হলো সব পোশাক ও পুরো নগ্ন হতে হলো। দ্বাররক্ষী নেতিকে যখন ইনান্না জিজ্ঞাসা করলেন যে কেন তাঁকে এত অপমানিত হতে হচ্ছে, তখন নেতি জানায়,
‘পাতালের নিয়মাবলি নিখুঁত,
এসব নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না।’ 

অবশেষে অগ্রজা এরেশকিগালের সভাকক্ষে ‘নগ্ন ও নত-মস্তক’ ইনান্নাকে ঢুকতে হলো আর তখন পাতালের বিচারকরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। আপন বড় বোন এরেশকিগাল ইনান্নাকে নানা অপরাধে অভিযুক্ত করে, শেষমেশ তাঁকে ধাক্কা দিলে ইনান্না একটি শবদেহে পরিণত হয় এবং তাঁকে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিন তিন রাত অপেক্ষার পর নিনশুবুর ইনান্নার কথা মতো ইনান্নার পিতা দেবতার এনকির কাছে সাহায্য চাইলে ‘নর নয়, নারীও নয়’ এমন দুজন ‘গাল্লা’-র সৃষ্টি হয় যারা ‘মাছির’ মতো পাতালে ঢুকে পড়ে দেখে যে পাতালের দেবী এরেশকিগালও প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করছেন। দুই ‘গাল্লা’ পাতালের দেবীর প্রসব বেদনায় সমব্যথা প্রকাশ করলে তিনি খুশি হয়ে তারা কী চায় জিজ্ঞাসা করলে দুই বৃহন্নলাই দেয়ালে ঝুলতে থাকা ইনান্নার জীবন ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ জানায়। বড় বোন সম্মতি দিলে দুই গাল্লা জীবনদায়ী খাদ্য ও জলের মাধ্যমে ইনান্নাকে জীবন ফিরিয়ে দেন। 

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে ইনান্নার পাতালে যাওয়া ছিল আসলে ‘স্বাচ্ছন্দ্য এলাকা’ বা জীবনের ‘কম্ফোর্ট জোন’ থেকে বের হয়ে নতুনত্বের পথে যাত্রা। আমরা যখন নতুন কোনো পথে চলি, তখন অনেক অহমিকা ত্যাগ করে বলতে গেলে সর্বরিক্ত হতে হয়। তবে এই সংগ্রামের পর জীবন তার পূর্ণ গৌরবে ফিরে আসে। স্বয়ং কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং এই পুরাণ নিয়ে বিশ্লেষণে ব্রতী হয়েছেন। 
এবার ফিরে আসি ভারত ও বাংলার একান্ত দুর্গাপূজায়। সেই মেসোপটেমীয় অঞ্চল থেকে বাংলা অবধি এই যে এক সিংহবাহিনী দেবীর বয়ান– কখনও মিসরে তিনি শেখমেত হয়ে ঠিক দুর্গার মধু পানের মতোই ডালিমের রস পান করে দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, আবার কখনও ইনান্নার বোন এরেশকিগাল নিজেই এক বৃষ দেবতার স্ত্রী ছিলেন– এই পুরাণগুলোর অনুষঙ্গ কীভাবে যেন পরস্পর জড়িয়ে আছে, তাই না? 
যেন কোথাও মানবজাতির এক দীর্ঘ পুরাণপথের যাত্রা শুরু হয়েছিল! গ্রিস-রোম-মেসোপটেমিয়া-সুমেরীয়-আক্কাদীয়-পারসিক নানা সভ্যতা পার হয়ে কবে দুর্গা বাংলায় এলেন একদম ‘উমা’ বা ঘরের মেয়ে হয়ে! 
তিনি শ্মশানচারী শিবের গৃহিণী, চার পুত্র-কন্যা গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মা। 
বছর চার দিন তিনি পিতৃগৃহে আসেন। আসুন, বাংলার সাদা কাশফুল ও শিউলিতে আমরা তাঁর পূজামণ্ডপ সাজিয়ে তুলি। 

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক 

আরও পড়ুন

×