ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ঐতিহ্যের আঁচলে বাঁধা এক সার্বজনীন উৎসব

ঐতিহ্যের আঁচলে বাঁধা এক সার্বজনীন উৎসব
×
×

সজীব সরকার

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতন ধর্মের অনুসারীদের এক মহোৎসব। তাই সবার জন্যই সতত সুখের ও আনন্দের। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে ছাপিয়ে এ উৎসব ঘোষণা করে মানুষে মানুষে মিলনের আহ্বান, পরস্পরের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হয়ে ওঠার এক অমোঘ বার্তা। উৎসবের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রয়েছে শান্তির। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহমর্মিতা থেকে যে সামাজিক শান্তির পরিবেশ তৈরি হয়, তা উৎসবের আনন্দকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই এ পূজা হয়ে ওঠে সার্বজনীন শারদ উৎসব।

সাহিত্য, সংগীত ও স্বাধীনতা আন্দোলনেও মা দুর্গা স্থান পেয়েছেন অনেক আগে থেকেই। কাজী নজরুল ইসলাম ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখে ব্রিটিশদের রোষানলে পড়েছিলেন, আবার বঙ্গভঙ্গের বেদনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন দুর্গার প্রতিমূর্তিতে বঙ্গমাতাকে নিয়ে বিখ্যাত গান। তারও আগে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ কিংবা অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’র মধ্য দিয়ে দুর্গা রূপ নেন দেশমাতার। ঋষি অরবিন্দের ‘দুর্গাস্তোত্র’ ১৯০৯ সালে তাঁর ‘ধর্ম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে বিপ্লবীদের প্রাণশক্তি জুগিয়েছিল।
দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় উৎসবের সম্মিলনে মানুষ অর্জন করে ‘আমরা’ হওয়ার বোধ। এক সময় অসাম্প্রদায়িক শিল্পীরা আরতি পরিবেশন করে পুরস্কার পেয়েছেন আর সাধারণ মানুষ তা উপভোগ করেছেন নির্দ্বিধায়। স্বামী বিবেকানন্দ একবার আলোয়ারের রাজার প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, মানুষ যেমন বাবার ছবিকে বাবার প্রতিকৃতি জেনে শ্রদ্ধা করে, তেমনি প্রতিমার মধ্যেও ঈশ্বরের অবয়ব কল্পনা করে ভক্ত আরাধনা করেন– মূর্তি নয়, তার ভেতরের দেবত্বই পূজিত হয়। ‘যত্র জীব তত্র শিব’ এই দর্শনে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ঘুচে যাওয়ার আহ্বান নিহিত। ভক্তবৃন্দ দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী রূপের ভেতরে চিন্ময়ী সত্ত্বার ভক্তি ভরে আরাধনা করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘রূপ-সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ-রতন আশা করি/ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী’। ধর্মসাধনার সারবস্তু নিহিত মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জীবন ও অপরের সুখ-সমৃদ্ধি কামনার মধ্যে। দুর্গাপূজার আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উচ্চারিত হয় সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের মন্ত্র; যার মাধ্যমে জাগ্রত করতে পারি মানবধর্ম ও মানবিক মূল্যবোধ।  

তবে আজকের দুর্গাপূজায় সাবেকি আরতি, ধুনুচি নাচ কিংবা পালাগান, রামপ্রসাদী গান, বেহুলা-লখিন্দরের নাটিকার জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে হিন্দি-ইংরেজি-ডিজে গান আর ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’র মতো আয়োজন। এর পেছনে বড় কারণ বাণিজ্যিক স্পন্সরশিপ। দেশের বড় বড় পূজামণ্ডপ আজ অনেকাংশে করপোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে; যারা তারুণ্যের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নিজস্ব শর্তে অর্থ জোগায়। এই পরিস্থিতি শুধু দুর্গাপূজায় নয়, প্রায় সব সামাজিক বড় আয়োজনেই আজ বিরাজমান। আরতি একটি সরল, অসাম্প্রদায়িক আয়োজন, যেখানে রাজনৈতিক ভাবাদর্শ সহজে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’র মতো অনুষ্ঠান জটিল উপস্থাপনার সুযোগ তৈরি করে, যা কখনও কখনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিরও জন্ম দেয়।
ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার কড়াল গ্রাস সমাজকে এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে আজ অন্তর্ভুক্তিমূলকতা প্রমাণ করার তাগিদ তৈরি হয়েছে। ফলে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে আজ মন্দির ও মাজার পাহারা দিতে হয় আর প্রতিরোধের বদলে সমাজে কেবল প্রতিকারের চেষ্টা চলছে। তবু আশার কথা, বাংলাদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে প্রতিবছর দুর্গাপূজায় সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। গত বছরও সারাদেশে ৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপ-মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সংখ্যাটি গত বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার ৫০০টি বেশি।

নিরাপত্তার বিষয়টি প্রতিবছরের মতো এবারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা শিক্ষা কাজে লাগিয়ে পূজামণ্ডপে আইপি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বিশেষ টিম গঠন, পুলিশ-র‍্যাব-আনসার-বিজিবির টহল, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। স্বাধীন ও সভ্য জাতি হিসেবে সবার ধর্ম যদি আমরা নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির সঙ্গে পালন করতে পারি তবেই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। গুজব ও ফেসবুকের মিথ্যা তথ্য দেখে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। উৎসব উদযাপন কমিটি ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত সবাইকে দেশের স্বার্থে শারদীয় উৎসবে অশুভ তৎপরতা রোধে কঠোর থাকতে হবে। 
দুর্গা নামের অর্থই হলো সংকট থেকে ত্রাণকারী। শাস্ত্রমতে ‘দ’ দৈত্যনাশক, ‘উ’ বিঘ্ননাশক, ‘র’ রোগনাশক, ‘গ’ পাপনাশক ও ‘আ’ ভয়-শত্রুনাশক– এই পাঁচ অক্ষরে গড়া দুর্গা নামটিই যেন সংকটমুক্তির প্রতীক। ২০২১ সালে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; যা শুধু সৌন্দর্য নয়, এ উৎসবের সহস্র বছরের সামাজিক ঐক্যের প্রতিও এক সম্মান। আজকের প্রয়োজন হলো, পূজার বাণিজ্যিকীকরণ ও রাজনীতিকরণের বিপরীতে তার মূল আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চেতনাকে ফিরিয়ে আনা। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’– এই প্রবাদকে প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা আর প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি, যা কোনো আইন বা প্রশাসনিক নির্দেশে নয়, বরং মানুষের অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ততা থেকেই জন্ম নিতে পারে। 

পিএইচডি গবেষক, কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
[email protected] 

আরও পড়ুন

×