ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাহাড় ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে

পাহাড় ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে
×

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন ঋতুপর্ণা চাকমা। সম্প্রতি তোলা- সংগৃহীত

 সাদিক শাহরিয়ার

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৪ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ১২:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৬ সালের ৩ মার্চ। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের ম্যাচ খেলতে নেমেছে চীনের বিপক্ষে। ম্যাচের তখন ১৪ মিনিট। কাউন্টার অ্যাটাকে বল পায়ে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। আপনি কি সেই সময়ে ঋতুপর্ণা চাকমার মুখখানা খেয়াল করেছিলেন? বজ্র কঠিন মুখ; কিন্তু একই সঙ্গে চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত মায়া আর আশার ঝলক। এই মুখটা বড্ড চেনা।

টিফিন ক্যারিয়ার হাতে সাত-সকালে গার্মেন্টসে ছুটতে থাকা অথবা প্রবল ভিড়ের মাঝে লোকাল বাসে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা দু’হাতে পাশাপাশি দুই চুলোয় চাপিয়ে দেওয়া তরকারি নাড়তে থাকা কোনো এক গৃহিণী– আপনার আশপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নারীর চেহারায় ঋতুপর্ণার চাকমার সেই বজ্র কঠিন মুখায়বের প্রতিচ্ছবি। যেই মুখখানা নারীর প্রতিদিনের লড়াই-সংগ্রামের গল্প বলে। পাহাড় থেকে এসে ঋতুপর্ণা চাকমার এক অন্যরকম পাহাড় ডিঙানোর গল্প বলে।

ঋতুপর্ণা চাকমার সংগ্রামের গল্পটা জানতে আমাদের যেতে হবে রাঙামাটি শহর পেরিয়ে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়িতে। প্রধান সড়ক পেরিয়ে মেঠোপথ আর ধানি জমির আল ভেঙে হাঁটাপথে পাড়ি দিতে হবে আরও এক ঘণ্টার পথ। এখানেই ব্রজবাসী চাকমা ও ভুজপতি চাকমা দম্পতির বাস। প্রথম তিন সন্তানই কন্যাসন্তান হওয়ায়; ব্রজবাসী ও ভুজপতি চাকমার দম্পতির আশা ছিল চতুর্থ সন্তান হিসেবে ছেলে সন্তান জন্মাবে। সে আশা পূরণ হলো না। ব্রজবাসী ও ভুজপতির চতুর্থ সন্তান হিসেবে জন্ম নিল ফুটফুটে এককন্যা সন্তান। ব্রজবাসী চাকমার বোন নিলোবানু চাকমা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের বিশাল ভক্ত। অভিনেত্রীর নামেই নিলোবানু ভাইয়ের মেয়ের নাম রাখলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। 

ব্রজবাসী চাকমার জমিজমা বিশেষ ছিল না। অল্প জমিতে যে চাষবাস করতেন তা দিয়ে সংসার চলত না। এরই মধ্যে এলো চরমতম দুঃসংবাদ। ব্রজবাসী চাকমার শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। চিকিৎসা যে করাবেন সেই সামর্থ্যও তাদের নেই। ততদিনে ঋতুপর্ণা চাকমার পর বংশের প্রথম ছেলে সন্তান হিসেবে জন্ম নিয়েছে পার্বণ চাকমা। চার মেয়ে ও এক ছেলেকে রেখে ২০১৫ সালে ক্যান্সারের কাছে হার মানলেন ব্রজবাসী চাকমা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মা ভুজপতি চাকমা তাঁর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পড়লেন এক অথৈ সাগরে। এদিকে ছোট্ট ঋতুকে ততদিনে পেয়ে বসেছে ফুটবলের নেশা।

মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম পরিচয় ঘটে ফুটবলের সঙ্গে। ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন। বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা ঋতুপর্ণা চাকমার ফুটবল প্রতিভায় ছিলেন রীতিমতো মুগ্ধ। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই ২০১৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে ট্রায়াল দিতে আসেন ঋতুপর্ণা। বাঁ পায়ের দারুণ কারুকাজ আর অসাধারণ ফুটবলশৈলীতে বিকেএসপির কোচদের নজর কাড়লেন তিনি। ট্রায়ালে প্রথম হয়ে ভর্তি হলেন বিকেএসপিতে। বিকেএসপিতে ভর্তি এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। সে টাকাও জোগাড় করে দিলেন ঋতুপর্ণার স্কুলের প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা।

ঋতুপর্ণার মেজ বোন চাকরি নেন চট্টগ্রামের এক তৈরি পোশাক কারখানায়। তাঁর বেতনেই চলে ঋতুপর্ণাদের সংসার। এরই মধ্যে বিকেএসপিতে ঋতুপর্ণার ৩-৪ মাসের বেতন বাকি পড়ে যায়। মেজ বোনের কানের দুল বন্ধক রেখে জোগাড় করা টাকায় পরিশোধ হয় সেই বকেয়া বেতন। 

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ক্যাম্পে ডাক পান ঋতুপর্ণা চাকমা। বয়সভিত্তিক দল হয়ে একসময় এসে থিতু হন জাতীয় দলে। এর পরের গল্পটা মোটামুটি সবার জানা। ২০২২ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের হয়ে দুটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। ২০২৫ সালে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে শক্তিশালী মিয়ানমারের বিপক্ষে ঋতুপর্ণার জোড়া গোলেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মঞ্চে।

২০২৩ সালে খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। খেলাধুলার পাশাপাশি নিজের অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রিও শেষ করতে বদ্ধপরিকর এই বাংলাদেশি ফরোয়ার্ড। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের হয়ে জিতেছেন একুশে পদক। ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জিতেছেন বেগম রোকেয়া পদক।

বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল দলকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপে খেলছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ঋতুপর্ণা স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার। ঋতুপর্ণা চাকমারা পারবেন। নিশ্চয়ই পারবেন। পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ, বাধাবিপত্তি আর চোখ-রাঙানি পেরিয়ে যে নারীরা এগিয়ে চলে; তাদের ঠেকানোর সাধ্য আছে কার!

আরও পড়ুন

×