ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ইউরোপের ছড়ি নাকি লাতিনের রাজত্ব

ইউরোপের ছড়ি নাকি লাতিনের  রাজত্ব
×

তরিকুল ইসলাম রাজন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ১৩:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তর আমেরিকার তিন দেশ– যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় বসছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ তথা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। আজ রাতে জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পর্দা উঠবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। এবারই প্রথম ৩২ দলের চেনা বৃত্ত ভেঙে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে চমকের সম্ভাবনাও। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে বরাবরের মতোই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে– ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব কি লাতিন আমেরিকাতেই থাকবে, নাকি ট্রফি আবার ফিরে যাবে ইউরোপে? 

ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বকাপে এ দুই মহাদেশের একচেটিয়া রাজত্ব। ইউরোপের দেশ ইতালি (৪), জার্মানি (৪), ফ্রান্স (২), ইংল্যান্ড (১) ও স্পেন (১) মিলে জিতেছে ১২টি শিরোপা। আর দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল (৫), আর্জেন্টিনা (৩) ও উরুগুয়ে (২) এই তিন দেশের ঘরে গেছে ১০টি শিরোপা। বিগত ৯২ বছর এই ধারা চলে আসায় এটিই এক ধরনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এবারের মেগা আসরেও থাকতে পারে সে ধারা। 
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ বছরের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে বিশ্ব জয় করেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনাল লাতিন ফুটবলের পুনর্জন্মের বার্তা দিয়েছিল। এর আগের দীর্ঘ ১৬ বছর টানা চারটি বিশ্বকাপ গিয়েছিল ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তির ঘরে। ২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিশ্বকাপ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্স। কাতার বিশ্বকাপে ‘মেসি-ম্যাজিকে’ লাতিনরা আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন ফিরে পায়।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার ট্রফি ধরে রাখার মিশন আর্জেন্টিনার। দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসির এটিই সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। চোটের ধোঁয়াশা কাটিয়ে বিশ্বকাপের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি যেভাবে স্বরূপে ফিরেছেন, তাতে বলা যায় আলবিসেলেস্তেরা এবারও হট ফেভারিট। তবে স্কোয়াডের বেশ কয়েকজন ফুটবলারের ফিটনেস নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কোচ লিওনেল স্কালোনির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। শেষ মুহূর্তে স্কোয়াডে কোনো পরিবর্তন করতে হলেও কোপা আমেরিকা ও বিশ্বজয়ীরা ট্রফি ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

লাতিন আমেরিকার আরেক পরাশক্তি ব্রাজিলের গল্পটা অবশ্য দীর্ঘশ্বাসের। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে সর্বশেষ ট্রফি জিতেছিল সেলেকাওরা। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহোদের সেই সোনালি সাফল্যের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। এই দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘হেক্সা’ বিশ্বকাপ ট্রফির খোঁজে হন্যে হয়ে আছে সাম্বার দেশ।

এবার ব্রাজিল দলে নেইমারের চোট ও ফর্মের ওঠানামা বড় এক আলোচনার বিষয়। তবে তার পাশাপাশি ভিনিসিউস জুনিয়র, রাফিনহা এবং এন্ড্রিকদের মতো একঝাঁক তরুণ বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ড রয়েছেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দলটির মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গেছে। লাতিন আমেরিকার বাছাই পর্বেও তাদের কিছুটা ধুঁকতে দেখা গেছে, যা ভক্তদের চিন্তায় রেখেছে। তবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে সাম্বা ম্যাজিক যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। ২৪ বছরের এই আক্ষেপ ঘুচিয়ে ট্রফি পুনরুদ্ধার করতে ভিনিসিয়ুস-নেইমাররা নিজেদের উজাড় করে দিতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি এবারের আসরে না থাকলেও ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিরা এবার আটঘাট বেঁধে নামছে শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেতে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকার তুলনায় ইউরোপের দলগুলোর স্কোয়াডের গভীরতা এবার অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ। কাতার বিশ্বকাপের রানার্স-আপ ফ্রান্স এবারও সবচেয়ে ক্ষিপ্রগতির দল। কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি ও ফিনিশিং ফরাসিদের আবারও ট্রফি এনে দিতে সহায়ক। 

এ ছাড়া জুড বেলিংহাম আর হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড এবার কাগজে-কলমে অন্যতম সেরা দল। বিশ্বমঞ্চে ট্রফির খরা কাটাতে মরিয়া ইংলিশরা। ইংল্যান্ড মনে করছে, দীর্ঘ ৬০ বছরের অতৃপ্তি ঘোচানোর এবারই তাদের মোক্ষম সুযোগ। আর টানা ৯ ম্যাচে জয় পেয়ে বিধ্বংসী ফর্মে থাকা জুলিয়ান নাগেলসমানের জার্মানিও শিরোপার অন্যতম দাবিদার। হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের স্পেন এবার অন্যতম বড় পরাশক্তি। এ ছাড়া ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালও যে কোনো প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের আধুনিক কৌশল ও গতি নিয়ে তারা লাতিনদের রাজত্বে হানা দিতে পুরোপুরি তৈরি।

ফুটবল-ঈশ্বর কি এবার মেসির হাতেই বিদায়ী উপহার হিসেবে টানা দ্বিতীয় ট্রফি তুলে দেবেন, নাকি ভিনিসিয়ুসের হাত ধরে ঘুচবে ব্রাজিলের দুই যুগের অপেক্ষা? নাকি এমবাপ্পে-বেলিংহামদের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলে আবার শুরু হবে ইউরোপের ছড়ি ঘোরানো? রোমাঞ্চ, উত্তেজনা আর আবেগের এই ফুটবল মহাযজ্ঞের শেষ দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব।

আরও পড়ুন

×