ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

বাঙালির আকাশে আকাশি-হলুদ

বাঙালির আকাশে আকাশি-হলুদ
×

স্বামীবাগের ফিফা গলিতে বিশ্বকাপ উন্মাদনায় মেতেছে দুই কিশোর। গতকাল বুধবার তোলা সাজ্জাদ নয়ন

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ১১:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড় থেকে সমতলের রং এখন আকাশি। এই বিশাল ক্যানভাসের সৌন্দর্য বেড়েছে হলুদ, নীল, লাল রঙে। কোথাও কোথাও শ্বেত শুভ্রে শোভিত। এই রঙের খেলায় মাতোয়ারা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ। আজ বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকেই ফুটবল বিশ্বকাপের আনন্দনগরীতে রূপ নেবে মহানগর থেকে মফস্বল। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় উৎসবের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে আরও আগেই। আজ থেকে তা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার পালা। বাঙালির বিশ্বকাপ বলে কথা, রাত জেগে বা সকালে টিভি সেটে খেলা দেখাতেও থাকবে ভোঁজবাজি। 

বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের কাছে আকাশি রং মানেই আর্জেন্টিনা। যে দেশের সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব বেশি না। সংস্কৃতি বা ক্রীড়াক্ষেত্রে তেমন কোনো বিনিময় চুক্তি না থাকার পরও বাঙালির কাছে সবচেয়ে পরিচিত দেশ আর্জেন্টিনা। দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসি দেশটির ব্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। এই বদ্বীপে সবচেয়ে জনপ্রিয় আর্জেন্টিনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার সময়কাল ১৯৮৬ সালকে ধরা হলে ১৯৯০-এ ফুটবল উন্মাদনার বিস্ফোরণ ঘটেছে। ওই সময়কালকে বলতে পারেন বাংলাদেশের ফুটবলের রেনেসাঁ। মেক্সিকোতে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাতে শিরোপা দেখা দিয়ে রোমাঞ্চের শুরু। পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের স্বাদ নেয় দেশটি। ওই বিশ্বকাপ দিয়েই কিংবদন্তি হয়ে ওঠা ম্যারাডোনার। ফুটবল অনুরাগী বাঙালির ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন ১৯৯০ সালে ইতালি বিশ্বকাপে। রেফারির পক্ষপাত সিদ্ধান্তে সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা হেরে গিয়েছিল লোথার ম্যাথিউসের পশ্চিম জার্মানির কাছে। কেঁদেছিলেন ম্যারাডোনা, কেঁদেছিল এই বঙ্গের বাঙালি। 

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ গণমানুষের হয়ে ওঠে ১৯৯০ থেকে সস্তার সাদাকালো টেলিভিশন ঘরে ঘরে জায়গা করে নেওয়ায়। হাটবাজার, দোকানঘর থেকে শুরু করে পাড়ার ক্লাব বা বাড়ির ড্রইংরুমে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল। ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতা, শিলাচি, দুঙ্গা, বেবেতো, রুথ গুলিত, লুই ফিগোর ভিউ কার্ডে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল ঢাকার বাজার। ওই থেকে তারকা-প্রেমে জমেছিলেন বাংলাদেশের মানুষ। সেই আবেগ একটুও ক্লিশে হয়নি আজও। বরং ডিজিটাল দুনিয়ার কারণে বেড়েছে বহু গুণ। মানুষ আর মাধ্যম বদলে গেলেও প্রেমাবেগ আগের মতোই। অনেক বছর হয়ে গেছে ফুটবল-ঈশ্বর ম্যারাডোনা চলে গেছেন আসল ঈশ্বরের কাছে। এই গ্রহে এখন ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি। এই নতুন ফুটবলের জাদুকরের হাতে ২০২২ সালে উঠেছিল বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার জয়ে আনন্দ মিছিল হয়েছিল ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আকাশি রঙের জার্সি পরে হাজার হাজার সমর্থকের ফাইনাল ম্যাচ দেখার ভিডিও হয়েছিল ভাইরাল। এই উন্মাদনা বিমোহিত করেছিল আর্জেন্টাইনদেরও। এই ফুটবল কূটনীতিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় দূতাবাস খুলেছে দেশটি। বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনার সম্পর্ক ফুটবলের সমর্থন দিয়ে শুরু হলেও ব্যাপ্তি বেড়েছে হয়তো আরও অনেক শাখায়। একেই বলে ফুটবলের জাদু। 
বৈশ্বিক টিভি চ্যানেলের বিকাশের সঙ্গে বাংলাদেশে ফুটবল দেখা অবারিত হয়েছিল প্রায় চার দশক আগে। টিভিতে খেলা দেখার সুযোগ আর্জেন্টিনা, জার্মানির সমর্থক গড়ে উঠতে সহায়ক হলেও ব্রাজিলকে পরিচিতি দিয়েছেন পেলে। ক্লাস ফাইভের পাঠ্যপুস্তকে থাকা ছোটগল্প ‘ফুটবলের রাজা পেলে’ আশির দশকের শিক্ষার্থীরা হৃদয়ে ধারণ করেন। কালো মানিক ব্রাজিলকে আলোকিত করেন ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে। তাঁর কৃতিত্ব পাঠ করে ব্রাজিলপ্রেমী হয়ে ওঠে সাত সমুদ্র তেরো নদীর এপারে বাংলার মানুষ। লাতিন বা দক্ষিণ আমেরিকার এ দুই দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরও কয়েকটি দেশের ফুটবল দলের ভক্ত হয়ে উঠেছে বহু বঙ্গসন্তান। জিনেদিন জিদানের খেলার ভক্ত হয়ে ফ্রান্সকে সমর্থন দিতে শুরু করেন অনেকেই। এখন তো কিলিয়ান এমবাপ্পের ভক্তের অভাব নেই। ২০১০ সালে স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে স্প্যানিশ সমর্থকও বেড়েছে। পর্তুগালের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ২৩ বছর ধরে বাঙালির কাছেও পরিচিত। বাংলাদেশে পাড়া-মহল্লার ফুটবল ম্যাচে গোল করে কিশোর-তরুণেরা সিআর সেভেনের গোল উদযাপনের স্টাইল অনুকরণ করে। লুই ফিগোর পরে রোনালদো একাই পর্তুগালকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করছেন। ক্রিশ্চিয়ানোর পর্তুগালকে নিয়ে এবার প্রত্যাশার বেলুন উড়ছে ঢাকার আকাশেও। তাঁর ক্যারিয়ারের মহাকাব্যের শেষ পর্বে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেখতে চায় অনেকেই। তার চেয়েও বেশি দেখতে চায় বিদায় মঞ্চকে বিজয়ী মেসিকে। 

গত দেড় দশকে আর্জেন্টিনার সমর্থক দ্বিগুণ হয়ে ওঠার কারণ হতে পারে মেসিদের ঢাকায় প্রীতি ম্যাচ খেলা। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলেন মেসিরা। উচ্চ মূল্যের টিকিট কেটে হাজার হাজার ফুটবলভক্ত সেই ম্যাচ উপভোগ করেছিলেন গ্যালারি থেকে। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ডানোনের প্রচার কাজে ঢাকায় এসে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ খেলেছিলেন জিদান। তাঁর ওই সফরেই বেড়ে গিয়েছিল হাজার হাজার ফ্রেঞ্চ সমর্থক। এভাবেই বিশ্বকাপ ফুটবল এবং বৈশ্বিক দলগুলো নিজেদের করে নিয়েছে বাঙালি। বিশ্বকাপ না খেলেও বাংলাদেশ বিশ্বকাপ সমর্থনে বিশ্বের অন্যতম সেরা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের পাগলপনা দেখে বিমোহিত বিশ্ব। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর পর থেকে বর্ণিল সব পতাকায় ছেয়ে যাবে দেশ। ঢাকার আমিনবাজার বা পুরান ঢাকাকে মনে হবে জাতিপুঞ্জ। এক একটি বাড়ির ছাদ ভাগাভাগি করে নেবে অনেক দেশের পতাকা। একই ঘরে আকাশি, হলুদ বা লাল জার্সি পরে ম্যাচ দেখে পরিবার। প্রিয় দলের হার-জিতে থাকবে দুই সহোদরের আনন্দ-বেদনা। মন খারাপ থেকে মনকষাকষি হতে কতক্ষণ? এই বদ্বীপে ৪০ দিনে আনন্দ, হাসি-কান্নার কত গল্পই না হবে! এই গল্প জীবন বিয়োগান্ত না হলেই হলো। 

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ দলের সমর্থন গড়ে ওঠে তারকা ফুটবলারকে কেন্দ্র করে। পেলের পরিচিতিতে ব্রাজিল পরিচিত। প্রজন্মান্তরে যার ব্যাপ্তি ঘটেছে রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো বা কার্লোসের মধ্যমে। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি মেসির কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরু হলেই পরিচিতি আর জনপ্রিয়তা বোঝার চূড়া সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকেও দেখা যাবে। ২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিলের সমর্থন কিছুটা ভাটার দিকে। মেসি বা রোনালদোর মতো দেশের পক্ষে নেইমার জুনিয়রের আলো ছড়াতে না পারা এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। এই বিশ্বকাপ উত্থান হতে পারে মেসি, রোনালদো বা নেইমারের উত্তরসূরি। সে পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে সমর্থকদের। এখন সময় বিশ্বকাপ উপভোগের। সে উৎসব শুরু হয়ে গেছে পতাকা উড়িয়ে, জার্সি পরে। টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া বিশেষ প্রতিবেদন ও ম্যাগাজিন প্রকাশ করে সমর্থনের উন্মাদনায় দিয়েছে ঢোলের বাড়ি। আজ মধ্যরাতে মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধন অনুষ্ঠান থাকবে বাঙালির ঘরে ঘরেও। শাকিরার গান আর নাচের তালে তালে বিশ্বের আর সব দেশের মতো দুলবে বাংলাদেশি সমর্থকদের হৃদয়। তবে বাঙালির আসল বিশ্বকাপের একাংশ শুরু ১৪ জুন ব্রাজিল-মরক্কোর ম্যাচে। তা পূর্ণতা পাবে ১৭ জুন আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়ার ম্যাচ শুরু হলে। 

আরও পড়ুন

×