ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ

বিশ্বকাপের জাঁকজমকের আড়ালে এক নিষ্ঠুরতা

বিশ্বকাপের জাঁকজমকের আড়ালে এক নিষ্ঠুরতা
×

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

বার্নি রনে

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ২২:৫৪ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ২৩:১৯

বিশ্বকাপ ফাইনালের ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো মিয়ামি থেকে বিলাসবহুল ব্যক্তিগত জেটে উড়ে যান কাতারে। দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির শেষকৃত্যে যোগ দিতে লুসাইলে গিয়ে রূপালী সিংহাসনে গম্ভীর মুখে বসে বৈশ্বিক রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি। ঠিক একই দিন অর্থাৎ গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভার্জিনিয়ায় তার গলফ কমপ্লেক্সে এক আনুষ্ঠানে ব্যস্ত ছিলেন। সেখানে পোটোম্যাক নদীর দৃশ্য উপভোগের জন্য ৪৬৫টি গাছ কেটে সাফ করা হয়।

ঠিক সেদিনই, আটলান্টায় বিশ্বকাপ ফ্যান-জোনের এক মাইলেরও কম দূরত্বে ‘ফ্রিডম পার্ক’ থেকে গৃহহীনদের উচ্ছেদ করার খবর সামনে আসে। আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই পৌর কর্মীরা পার্কে ঢুকে সেখানে তাঁবু খাটিয়ে থাকা লোকজনকে জোরপূর্বক আবর্জনার মতো সরিয়ে দেয়।

শহরের এক কর্মকর্তা সাফাই গেয়ে বলেন, ‘ফ্রিডম পার্ক কোনো আনুষ্ঠানিক আশ্রয়শিবির ছিল না, তাই উচ্ছেদের আইনি নিয়মকানুন এখানে প্রযোজ্য নয়। পুরো ঘটনাটিকে পার্কের রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ।’ 

এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘মধ্যরাতে ওরা আমাকে সেখানে নিয়ে নামিয়ে দিল। ওটা আসলে একটা গুদামঘর ছাড়া কিছু নয়। দেখতে অবিকল ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির বন্দিশিবিরের মতো লাগছিল। আমি সেখান থেকে পালিয়ে এবং পুরো পথ হেঁটে আবার এখানে ফিরে আসি। সবকিছুই করা হচ্ছে বিশ্বকাপের জন্য। পর্যটকদের কাছে শহরকে চকচকে দেখানোর চেষ্টা চলছে। তারা চায় না কোনো কুৎসিত দৃশ্য চোখের সামনে থাকুক।’ 

আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের ঠিক আগের দিন ফ্রিডম পার্ক সম্পূর্ণ ফাঁকা দেখা যায়। চারপাশের অভিজাত বাড়িগুলোর মাঝে এই সবুজ চত্বরে আগের দিন পর্যন্ত থাকা তাঁবু, ব্যাগ কিংবা চেয়ারের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট রাখা হয়নি।

স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর প্রায় প্রতিটি শহরেই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গৃহহীনদের এভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। আটলান্টার মেয়র আন্দ্রে ডিকেন্স অবশ্য লুকোচুরির কোনো চেষ্টা করেননি। গত বছরই তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আশ্রয়হীনরা যেন আটলান্টার মূল শহরের আশেপাশেও ঘেঁষতে না পারে—তা কেবল বিশ্বকাপের সময়ই নয়, এখন থেকেই।’

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিও ঠিক একই লাইনে। গত আগস্টে পিচট্রি সিটির এক অনুষ্ঠানে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, ‘আটলান্টার ডাউনটাউনে হাঁটার সময় আপনার পরিবারকে যেন কোনো পাগলের চিৎকার শুনতে না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’ তার এই মন্তব্য বর্ণবাদী ও নিষ্ঠুরতার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত হয়।

আটলান্টা শহর কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপ সামনে রেখে ‘ডাউনটাউন রাইজিং’ নামে একটি মেগা প্রকল্প চালু করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে গৃহহীনদের ক্যাম্প উচ্ছেদ করা। তবে ফ্রিডম পার্কের ঘটনা প্রমাণ করে, শহর কর্তৃপক্ষ কাজ গুছাতে গিয়ে চরম নির্মমতার আশ্রয় নিয়েছে।

কাগজে-কলমে নিয়ম বদলালেও বাস্তবে কী ঘটছে, তা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। ফ্রিডম পার্কের ঠিক বিপরীত পাশে ‘ফুলটন কাউন্টির সেন্টার ফর হেলথ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনে’ গৃহহীনদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তির চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানকার এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, বিশ্বকাপ চলাকালীন রাস্তাঘাটে মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। বিশ্বকাপের এই সময়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে বলে খবর বের হলেও, আসলে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বা তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর খাটানো হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কারো ধারণা নেই।

তিনি বলেন, ‘বাস্তবে কী ঘটেছে তার কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, তবে আমরা এটুকু জানি যে মানুষগুলো আর এখানে নেই। তাহলে তারা গেল কোথায়? তাদের অনেকেই এই নির্দিষ্ট এলাকাতেই থাকতে চেয়েছিল। এখন তাদের শহরের বাইরে কোথাও দূরে ফেলে আসা হয়ে থাকতে পারে।’

আটলান্টায় বিশ্বকাপ চলাকালীন সরকারি কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্র খোলা হয়নি। ‘ক্রসরোডস কমিউনিটি সেন্টারে’ আসা সিরিয়াস নামের এক গৃহহীন তার তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জানান, শহরতলির একেবারে শেষ প্রান্তে মেট্রেপলিটনের এক নির্জন এলাকায় তাদের নিয়ে ফেলে আসা হচ্ছে, যাতে তারা পর্যটকদের চোখে না পড়েন।

বিশ্বকাপের জাঁকজমকের আড়ালে এই নিষ্ঠুরতা স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের এক কদর্য রূপকেই উন্মোচিত করে। ফিফা যেখানে ফুটবলকে ‘বিশ্বকে এক করার মাধ্যম’ বলে প্রচার করছে, সেখানে আটলান্টার রাজপথে বেঁচে থাকার লড়াই করা কিছু মানুষ এই উৎসবের মঞ্চ থেকে কেবল বিতাড়িতই হলেন না, বরং শিকার হলেন চরম লাঞ্ছনার।

বার্নি রনে: দ্য গার্ডিয়ানের ক্রীড়া বিষয়ক প্রধান লেখক

আরও পড়ুন

×