হানি ট্র্যাপ নিয়ে অনেক কথা
.
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৬ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৫ | ১১:৪৩
নকল কল সেন্টারের মাধ্যমে প্রতারণা নতুন ঘটনা নয়। কখনও সফটওয়্যার বিক্রির প্রলোভন, কখনও ইন্স্যুরেন্স রিনিউয়াল, আবার কখনও কম্পিউটারে কারিগরি সহায়তার নাম করে অনলাইনে টাকা হাতিয়ে এই প্রতারণা চক্রের কাজ চলছে রমরমা।
সাধারণত অনেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাতানো ফাঁদের লোভ এড়িয়ে যেতে পারেন না। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়ত এভাবে অনলাইনে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা করে ডার্ক ওয়েবের সহায়তায় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে কনভার্ট করা হচ্ছে। ফলে অভিযুক্তকে শনাক্ত করা অনেকটাই কঠিন। কারণ, সবটাই ঘটে ভার্চুয়ালি। চলমান এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রতিটি দেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইন কঠোর প্রয়োগ দৃশ্যমান করা প্রয়োজন। কারণ, বহু ঘটনায় ধরাশায়ীরা আইনের পথে কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান।
অন্যদিকে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, কল সেন্টারের মাধ্যমে ইদানীং নতুন ধারায় হানি ট্র্যাপ করা হচ্ছে। এমন ফাঁদে পড়লে টাকা তো গচ্চা যাবেই, উপরন্তু ব্ল্যাকমেইল করে একই ভুক্তভোগীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করছে এই প্রতারণা চক্র।
অর্থাৎ ভুয়া কল সেন্টারের হানি ট্র্যাপ থেকে আয়ের পথ এখন দুটি। কাজেই প্রতারণা করে হাতানো অর্থের অঙ্কও বেশ বড়। অনেকে এই হানি ট্র্যাপকে একটু অন্য ধরনের এসকর্ট সার্ভিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এমন ক্ষেত্রে প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার হলো নির্দিষ্ট কিছু কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। যেগুলো যারা জানে, শুধু তারাই চিনতে পারে।
ভুয়া কল সেন্টার
কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো ভুয়া কল সেন্টারে ৫০ জন কাজ করলে তার মধ্যে কয়েকজন নিয়ে বিশেষ গ্রুপ তৈরি করা হয়। যারা কথাবার্তায় হবে চৌকস, গ্রাহক বা টার্গেটের মনে বিশ্বাস তৈরিতে অতীতে যারা ভালো কাজ করেছেন, তাদের নিয়ে কাজ করা হয়।
প্রধানত তাদের নেতৃত্বে কাজ করে বেশ কয়েকজন। এদের অনেককে আগেই বাছাইয়ের পর সম্পৃক্ত করে কয়েক ধরনের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নতুন টার্গেটের তালিকাও তৈরি করে আগের অভিজ্ঞরা। কল সেন্টারের নির্ধারিত কিছু কর্মীর কাজ হলো নতুন টার্গেটে ওই কোড ব্যবহার করা। ভাষার তালিকায় রয়েছে– স্পেশাল ম্যাংগো, ফ্লাওয়ার, কম্প্যানিয়নশিপ, জিএফই (গার্লফ্রেন্ড এক্সপেরিয়েন্স)। ভুয়া কল সেন্টারের বিশেষ দায়িত্বে থাকা কর্মীরা শুধু এতটুকু জানেন, ওসব বিশেষ পরিষেবার কোড, যা গ্রাহক নিলে পাবেন বিশেষ ছাড়ের সুব্যবস্থা। কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ প্রতারণার উদ্দেশ্যে গ্রুপটি যাচাই-বাছাই করে এমন সবাইকে তালিকাভুক্ত করে, যারা পর্নো সাইট, বিশেষ পরিষেবা বা সঙ্গী খোঁজার কয়েকটি অ্যাপে নিয়মিত অভ্যস্ত। এমন কোনো গ্রাহক যদি জানান, তাঁর পাঁচটি স্পেশাল ম্যাংগো প্রয়োজন, তা হলে রিপোর্টিং বিভাগ কল সেন্টারের নেতাকে তা অবহিত করেন।
খবরটি তাৎক্ষণিক ভুয়া কল সেন্টারের আরও ওপরের স্তরে পৌঁছে যায়। তখন নির্বাচিত পাঁচ তরুণীকে পর্যায়ক্রমে পরিষেবায় আগ্রহী ওই ব্যক্তির সঙ্গে কয়েকটি অ্যাপে, অনলাইনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে ভুয়া কল সেন্টারটি। কিন্তু অর্থের দাবি একবারে শেষ হয় না। ক্রমে ওই তরুণীরা বন্ধুত্ব করে ঘনিষ্ঠ হন ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির। ক্রমান্বয়ে অ্যাপ থেকে ভিডিওকলে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করেন। সুযোগ বুঝে টার্গেট করা ব্যক্তির কোনো আপত্তিকর ছবি তুলে বা ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি আর সাইবার মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ, হোটেলে কয়েক ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়।
ওইসব মুহূর্তে কৌশলে ধারণ করা হয় টার্গেট ব্যক্তির বিশেষ মুহূর্তের ছবি। পরে সেসব কনটেন্ট ধরে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। কয়েক দফায় চাওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ভুক্তভোগী।
সাইবার ক্রাইম গবেষকরা বলছেন, ভুয়া কল সেন্টার থেকে বিশেষ কোড ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে বহুমাত্রিক হানি ট্র্যাপ পেতে প্রতারণার অনেক ঘটনা সামনে আসছে। এ যেন রমরমা ব্যবসা কৌশল। ঘটনার শিকার যে কেউ শুধু যে অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন তা নয়, বিপরীতে ব্ল্যাকমেইলের মুখোমুখি হচ্ছেন।
সংযত জীবনাচরণ, ভার্চুয়ালি সতর্ক, হুট করে কাউকে বিশ্বাস না করা, স্মার্ট ডিভাইস ও অ্যাপ ব্যবহারে বিশেষ নিরাপত্তাবলয় তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞরা।
- বিষয় :
- প্রতারণা
- হানি ট্র্যাপ
