দৃষ্টিহীনের চোখে কৃত্রিম আলো
দৃষ্টিহীনদের জন্য স্মার্ট চশমা তৈরি করে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে এআই
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১২:৪৭ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১৮:২৯
সারাবিশ্বের জীবনবৈচিত্র্যে এআই মানবজীবনে বিশেষ সঞ্চালকের (অ্যাকসেলেটর) ভূমিকায় কাজ করছে। জটিল কোনো পরিকল্পনা হোক বা পড়ালেখা– সব ক্ষেত্রেই এআই এখন ট্রেন্ড। কিন্তু মানবজীবনে কার্যত এর ভূমিকা কতটুকু? এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য স্মার্ট চশমা তৈরি করে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে এই অদম্য প্রযুক্তি।
স্মার্টফোন, স্মার্টঘড়ির পর এখন স্মার্ট চশমার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। এতদিন স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে, ছোটখাটো কাজ করতে অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হতো। এবার এআই সেই নির্ভরতাকে অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এমনটাই মনে করছেন ব্রিটেনের গ্যাজেট বিশ্লেষক টিলি ডাউলার।
লন্ডন ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন টিলি, যার দৃষ্টিশক্তির মাত্র ১০ শতাংশ কার্যকর। টিলি বলেছেন, যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অসম্ভব মনে হয়েছিল, শুধু স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে সেই ম্যারাথনের জন্য আমি প্রস্তুত হয়েছি।
দৌড়ের সময় টিলি এই নতুন এআই পরিচালিত ওকলি মেটা ভ্যানগার্ড স্মার্ট চশমার সহায়তা নিয়েছেন, যা পথ চিনতে ও তিনি কতটা দৌড়চ্ছেন, তার ট্র্যাক করতে সহায়তা করেছে।
ঘটনা শুধু এটাই নয়, দৌড়ের সময়ে লাইভ ডেটা, অর্থাৎ চারপাশে কী ধরনের ল্যান্ডমার্ক রয়েছে বা কোনো বাধা রয়েছে কিনা– এসব এখন আর কাউকে বলে দিতে হয় না। তাৎক্ষণিক এআই চশমাই সব আপডেট জানিয়ে দেয়। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে টিলি বললেন, আমি গান চালিয়ে দৌড়ালেও এআই গাইডের কথা ঠিকঠাক শুনেছি। আমার কাছে এই দৌড়ে অংশ নেওয়া কখনোই প্রতিযোগিতা নয়; বরং বিশেষ অনুপ্রেরণা। স্বপ্নপূরণে এআই চশমা যেন সারথি হয়েছে।
টিলি কিন্তু একা নন; সারাবিশ্বের দৃষ্টিহীন বা আংশিক দৃষ্টিহীনরা এখন এআই স্মার্ট চশমা ব্যবহার করছেন। বিশেষ এই ডিভাইসের বিশেষত্ব হলো এতে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা আর ওপেন-ইয়ার স্পিকার সংযুক্ত রয়েছে, যা ভয়েস কমান্ডে বিরতিহীন নির্দেশনা দেয়। চারপাশে কী কী আছে, সেসব তথ্য ঠিকঠাক দৃষ্টিহীনের কাছে পৌঁছে দেয়। মনে হবে যেন কোনো মানুষ পাশে থেকে পথের নির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। অনেকের কাছে ওই চশমা এখন সব সময়ের সঙ্গী।
সবচেয়ে জনপ্রিয় স্মার্ট চশমাগুলোর একটি তৈরি করেছে মেটা। সংস্থাটি রে-ব্যান ও ওকলির সঙ্গে মিলে এটি বানিয়েছে। ইতোমধ্যে সারাবিশ্বে ৭০ লাখের বেশি মেটা রে-ব্যান চশমা বিক্রি হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে
চশমার সামনে থাকা ক্যামেরা চারপাশের ছবি বা ভিডিওকে ধারণ করে। তারপর মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে এই ডেটা সরাসরি চশমা থেকে বা যে কোনো ডিভাইসের মাধ্যমে এআই সার্ভারে পাঠানো হয়। এভাবে প্রাপ্ত সব ডেটাকে সেখানে এআই চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। অর্থাৎ পথের সামনে কী আছে, কোনো বাধা-বিপত্তি আছে কিনা, তা যথাযথ যাচাই করা হয়। তারপর প্রাপ্ত ফলাফল অডিওতে রূপান্তর করে জানানো হয়, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে চশমার ভেতরে বসানো স্পিকারে দৃষ্টিহীনদের শোনানো হয়।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, স্মার্ট চশমা ব্যবহারে বেশ কিছু সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। কোনো বড় ইভেন্টে বা জনবহুল জায়গায় ভিড়ের কারণে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়লে সে সময় তাৎক্ষণিক সঠিক তথ্য না পাওয়ার সমস্যা তৈরি হবে। এ ছাড়া এই চশমা কখনোই স্বাভাবিক মানুষের প্রতিস্থাপক হতে পারবে না।
স্মার্ট গ্যাজেট বিশেষজ্ঞ টমি ডিন বলেন, এই চশমা দৃষ্টিহীনদের একা চলার স্বাধীনতা বাড়াবে ঠিকই, কিন্তু এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না। তবুও কৃত্রিম মেধাকে কাজে লাগিয়ে এই নতুন উদ্ভাবনা দৃষ্টিহীনদের জীবনে চলার পথে নিঃসন্দেহে নতুন আশার আলোর কথা বলছে।
