লকডাউনের দিনগুলি : শিবচর
'আর কয়দিন বন্দি থাকমু'
লকডাউনের সময়ে বাইরে বেরোনোর সুযোগ নেই শিবচরের এই দুই শিশুর। এর পরও তাদের একজনের হাতে বিজয় চিহ্ন। এ যেন করোনা জয়ের দৃঢ় প্রত্যয়- সমকাল
সোহেব আহমেদ ও মোহাম্মদ আলী মৃধা, শিবচর (মাদারীপুর) থেকে
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২০ | ১৪:২৩ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২০ | ১৪:৩৫
'হাটবাজারে যাইতে পারি না। রসুন, পেঁয়াজ, ধনিয়া, মসুরি, কলাই ফসল উঠছে। তাও বেচতে পারছি না। গ্রামের আনাচে-কানাচে থাকা দু-একটি মুদি দোকান খোলা পাই মাঝেমধ্যে। সেখান থেকে চাল, ডাল, তেল, নুন কিইন্না আনি। আয়- রোজগার বন্ধ। এইভাবে আর কয়দিন? আর কয়দিন বন্দি থাকমু?' এভাবেই নিজের অবস্থার কথা বলছিলেন করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনে অবরুদ্ধ মাদারীপুরের শিবচরের রাজারচর গ্রামের কৃষক মো. তৈয়ব মোল্লা।
শিবচর উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয় গত ১৯ মার্চ। দেশে সর্বপ্রথম লকডাউন করা উপজেলা শিবচরের চারটি এলাকা পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। উপজেলার ১৭ স্পটে মোতায়েন করা হয়েছে আড়াই শতাধিক পুলিশ। রাস্তায় রাস্তায় চলছে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন শহর ও গ্রামের প্রায় সবাই। এমন ঘরবন্দি অবস্থার ১২তম দিন আজ। অন্যান্য উপজেলা থেকে শিবচরে প্রবেশের সড়কগুলোও রাখা হয়েছে অবরুদ্ধ করে। হাটবাজারগুলো প্রায় বন্ধ। পুলিশ খুব প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের হতে দিচ্ছে না। শিবচরের ভেতর দিয়ে যাওয়া ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ বড় রাস্তাঘাটে যানবাহন চলছে না। ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ। থমথমে গোটা এলাকা লকডাউনের শুরু থেকেই। এভাবে আয়-রোজগার বন্ধ থাকলে জীবন কীভাবে চলবে, তা নিয়ে শঙ্কিত এলাকার কৃষক, শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। যত দ্রুত সম্ভব, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে চান সবাই।
শিবচরের প্রত্যন্ত গ্রাম রাজারচর আজগর হাওলাদারকান্দির রাস্তার পাশে টং তুলে চা-পুরি বিক্রি করেন হায়দার আলী। লকডাউনের কারণে গত ১০ দিন ধরে বন্ধ তার দোকান। দোকানি হায়দার জানান, তিনি প্রতিদিন বিকেলে চা ও পুরি বিক্রি করে সংসার চালান। এখন দোকান বন্ধ থাকায় রোজগারও বন্ধ। এভাবে আর কিছুদিন গেলে জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়বে।
অবরুদ্ধ শিবচর পৌর এলাকার পাশের বহেরা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাবেক স্কুলশিক্ষক সিরাজুদ্দিন মাদবর। অবসর নেওয়ার পর স্থানীয় বহেরাতলা বাজারে বই-খাতা বিক্রির দোকান দেন তিনি। লকডাউনের কারণে তার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, রাস্তাঘাটে কোনো মানুষ নেই। খুব ভোরে সামান্য সময়ের জন্য বাজার বসলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় তরিতরকারি কিনেই মানুষ দ্রুত ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। পুলিশও কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। দোকান বন্ধ, আমার আয়-রোজগারও বন্ধ। এভাবে কীভাবে বেঁচে থাকব?
শিবচর পৌর এলাকার বাসিন্দা উমেদপুরের নুরুল আমিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহকারী অধ্যাপক জহির রায়হান বলেন, ঘরেই বসে থাকি- এটা তো একটু সমস্যাই। লকডাউন দরকার ছিল, তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে দিনে দিনে। বিশেষ করে দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ খুব কষ্টে আছেন। যদিও উপজেলা প্রশাসন সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে।
শিবচরের কঠোর অবরুদ্ধ এলাকার অন্যতম পাঁচ্চর ইউনিয়নের একটি গ্রাম, যেখান দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। পাঁচ্চর মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। সরেজমিন গিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের টহল জিপের দেখা মিলল সেখানে। এক সেনা সদস্য জানালেন, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। খাবারসহ কারও কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা সেসব দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ্চর বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, মাত্র একটি ডিসপেন্সারি ও তার পাশের একটি ফলের দোকান খোলা। মোড়ের অন্যসব মার্কেট বন্ধ। রাস্তার একপাশে মাস্ক নিয়ে বসে আছেন এক ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। তবে কোনো ক্রেতা নেই। যাত্রী না থাকায় অদূরে অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে ভেতরে ঝিমাচ্ছিলেন চালক। ঝুঁকি নিয়ে কেন বের হয়েছেন, জানতে চাইলে আল আমিন নামের ওই চালক বলেন, 'এক সপ্তাহের বেশি কোনো ইনকাম নাই। সবাই তো সরকারি সাহায্য পাচ্ছে না। কাজে বাইর না হতে পারলে তো আমরা না খেয়ে মারা পড়ব। কবে লকডাউন শেষ হইব সেই চিন্তায় আছি।'
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিবচর উপজেলা চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন খান জানান, কাঁচাবাজার ও চালের বাজার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। লকডাউন এলাকাগুলোতে দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
শিবচর উপজেলার ইউএনও আসাদুজ্জামান জানান, এ পর্যন্ত ৩০০ দরিদ্র পরিবারকে চাল-ডাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। যাতে তাদের কোনো সমস্যা না হয়। যারা চাইবেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন তাদের খাবার পাঠানো হবে।
মাদারীপুর জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল শিবচর) আবীর হোসেন জানান, শিবচর উপজেলার লকডাউন ঘোষিত চারটি এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। যাতে অন্য এলাকার বাসিন্দারা এসব এলাকায় প্রবেশ করতে না পারেন। এই চার এলাকার ৭৮ হাজার মানুষকে প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ শিবচরের সংসদ সদস্য নূর-ই আলম চৌধুরী লিটন বলেন, করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে জনগণকে সতর্কতা মেনে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চলার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে লকডাউন তুলে নেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে এ উপজেলায় সম্প্রতি ৬৩৯ জন ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও জার্মানি থেকে ফিরেছেন। গত ৭ মার্চ শিবচরে আসেন এক ইতালি প্রবাসী। তার শরীরে কভিড-১৯ করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। পরে আক্রান্ত হন তার স্ত্রী, দুই শিশুসন্তান, বৃদ্ধ বাবা, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ঘনিষ্ঠ আরও ৯ জন। মারা যান তার বাবা। এ পরিস্থিতিতে শিবচরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এখন পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা পরিবারের সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজারেরও বেশি। লকডাউনের ফলে নতুন সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
সর্বশেষ পরিস্থিতি : করোনা সন্দেহে শিবচরসহ মাদারীপুর জেলায় মোট ২৯৮ জন কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এর মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে ২৯৫ জন এবং হাসপাতাল কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন তিনজন। মাদারীপুর সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে রয়েছেন তিনজন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, এ পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে রিলিজ পেয়েছেন ২৬১ জন। শিবচর উপজেলায় করোনা আক্রান্ত পরিবারের পাঁচজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
- বিষয় :
- লকডাউন
- শিবচর
- করোনার প্রাদুর্ভাব
