ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৮ কিলোমিটারে ‘আটকা’ দুই সড়কের সুফল

৮ কিলোমিটারে ‘আটকা’ দুই সড়কের সুফল
×

মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৩ | ০৭:১১

নির্মাণকাজের সময় বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা। ব্যয়ও বেড়েছে দফায় দফায়। কিন্তু বারবার সড়কের কাজ থমকে গেছে ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায়। এভাবেই কেটে গেছে কয়েক বছর। বেহাল সড়কের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে জনগণ। ঘটছে দুর্ঘটনা। এমন চিত্র ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ-আঠারবাড়ী সড়ক এবং নেত্রকোনা-ঈশ্বরগঞ্জ সড়কের। দুটি সড়কের কাজ অনেকটুকুই শেষ হয়েছে। কিন্তু ৮ কিলোমিটার অংশে কাজ করতে না পারায় পুরো সড়কের সুফল আটকে আছে।

নেত্রকোনা জেলার বিশিউড়া থেকে ঈশ্বরগঞ্জ পর্যন্ত সাড়ে ২৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর। ২৬১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প ২০১৭ সালের মে মাসে অনুমোদন পায়। নির্মাণকাজ পায় যৌথভাবে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তখনই শুরু হয় ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। প্রকল্প এলাকার মধ্যে নেত্রকোনা ছাড়াও পড়েছে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা। এই দুই উপজেলায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে কাজ করা যাচ্ছে না।

এই সড়ক নির্মাণ হলে নেত্রকোনা থেকে ঢাকাগামী যানবাহন ঈশ্বরগঞ্জ ও নান্দাইলের কানুরামপুর হয়ে ত্রিশাল দিয়ে কম সময়ে যেতে পারবে। এতে অনেকদূর ঘুরে ময়মনসিংহ শহর হয়ে যাওয়ার ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

প্রকল্পের মেয়াদ প্রথম দফায় ২০২০ সালের ডিসেম্বর, দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী অধিগ্রহণে ভূমির ক্ষতিপূরণের মূল্য দেড় গুণ ধরা হলেও সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিন গুণ করতে হয়। এ ছাড়া তিনটি অতিরিক্ত সেতু ও অতিরিক্ত ২ হাজার ৪৩২ মিটার সড়ক নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সংশোধিত প্রকল্প তৈরি হয়। ৪৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি একনেক সভায় সংশোধিত হিসেবে অনুমোদন দিয়ে তৃতীয় দফা সময় বাড়িয়ে নির্মাণের শেষ সময় ধরা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এদিকে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০২২ সালের আগস্টে কাজ থেকে অব্যাহতি চেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। তবে তা বাতিল করে দেয় সড়ক বিভাগ। ওই ঠিকাদারদের দিয়েই কাজ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয় সড়ক বিভাগের সভায়। সড়কটির কাজ যেন দ্রুত করা যায়, সে জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত মে মাসেও ময়মনসিংহ সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দিয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে চতুর্থ দফায় ফের এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ১০২ কোটি টাকা বিল পেয়েছে। নেত্রকোনা অংশে পুরোপুরি এবং ময়মনসিংহে আংশিক কাজ হয়েছে। কাজ শেষ হতে বিলম্বের কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতাকে দায়ী করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। অধিগ্রহণের টাকা বিতরণ শুরু করলেও তা সম্পন্ন করতে পারছে না ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন।

তিন কিলোমিটারের জন্য দুর্ভোগ

আঠারবাড়ী থেকে ঈশ্বরগঞ্জ পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ২০২০ সালের মার্চে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ১১৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ ২০২২ সালের জুনে সম্পন্ন করার কথা ছিল। সড়কটির অন্য অংশে কাজ শেষ হলেও ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভা অংশে অন্তত ৩ কিলোমিটারজুড়ে কাজ করা যাচ্ছে না। অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে জমি ছাড়তে না চাওয়ায় আটকে আছে সেখানে নির্মাণকাজ। সড়কটির কাজ শেষ না হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি। অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে না পারায় অব্যাহতি চেয়ে সড়ক বিভাগের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু সড়ক বিভাগ আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়েই কাজ করানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই সড়েকেই ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকায় যুক্ত হয়েছে নেত্রকোনা থেকে আসা সড়কটি।

এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. আবদুস ছাত্তার বলেন, দুটি সড়কের কাজ সামান্য অংশে আটকে রয়েছে। এতে সড়ক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় বদনাম হচ্ছে সরকারের। সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সড়ক দুটির কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

ক্ষতির মুখে ঠিকাদাররাও

সঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বাড়লেও সে অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়েনি। পুরোনো বরাদ্দেই উচ্চ ব্যয়ে কাজ করতে হয় তাদের। নেত্রকোনা-ঈশ্বরগঞ্জ সড়কের ঠিকাদার মেসার্স রিজভী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন আহমেদ পান্না বলেন, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। নেত্রকোনা অংশের জমি বুঝিয়ে দেওয়ায় সেখানে কাজ শেষ। কিন্তু ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় কাজ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমি কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা বুঝানো যাবে না। এখন কাজটি সম্পন্ন করলেও অন্তত ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হবে। ব্যাংক দেনায় ধুঁকছি। কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় মানুষও সুফল পাচ্ছে না।’

আঠারবাড়ী-ঈশ্বরগঞ্জ সড়ক নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের ব্রাদার্সের সহকারী ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কাজ করতে না পারায় বারবার সময় বাড়াতে হচ্ছে। সড়কটি সঠিক সময় করা গেলে মানুষ উপকৃত হতো এবং আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতাম না।

কর্মকর্তারা যা বলেন

কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ মোজাম্মেল হক বলেন, অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে আঠারবাড়ী-ঈশ্বরগঞ্জ সড়কটির কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। ঠিকাদার কাজ না করার জন্য আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। নতুন করে প্রকল্পের সময় বাড়ানো হচ্ছে। নেত্রকোনার সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী তারিফুল হক খান বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে ছিল কাজ। ইতোমধ্যে লোকজন ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে শুরু করেছে। ঠিকাদার দ্রুত কাজ শুরু করবে। সময় বাড়লেও নির্মাণ ব্যয় নতুন করে বাড়বে না।

তবে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সার্ভেয়ার মো. কবির হোসেন বলেন, নেত্রকোনো-ঈশ্বরগঞ্জ সড়কটির ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন নিয়ে জটিলতা ও ঈশ্বরগঞ্জ-আঠারবাড়ী সড়কটির নকশার জটিলতার কারণে অধিগ্রহণে বিলম্ব হয়েছে। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ঈশ্বরগঞ্জ-নেত্রকোনা সড়কের ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণ শেষের দিকে। আঠারবাড়ী-ঈশ্বরগঞ্জ সড়কের বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। এটিও সমাধানের পর্যায়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

×