ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লোহার পণ্য পরিবহনে চলাচলে ঝুঁকি

লোহার পণ্য পরিবহনে চলাচলে ঝুঁকি
×

ভ্যানে করে অরক্ষিত অবস্থায় ঢেউটিন নিয়ে যাচ্ছেন এক চালক। এভাবে লোহার তৈরি পণ্য পরিবহনের কারণে প্রায়ই সড়ক-মহাসড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। তবুও সতর্কতায় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। শুক্রবার ফুলবাড়ী পৌর এলাকার কাজী রোডে সমকাল

আজিজুল হক সরকার, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

পেশায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক বাদশা হোসেনের বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুরে। গত বৈশাখের এক সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎই বিপরীত দিক থেকে তাঁর কাছে চলে আসে একটি ভ্যান। সেটিতে অরক্ষিতভাবে বহন করা হচ্ছিল নতুন ঢেউটিন। প্রাণে বাঁচতে তাৎক্ষণিক সড়ক থেকে মোটরসাইকেল নামিয়ে দেন পাশের পুকুরে। অল্পের জন্য রক্ষা পান বাদশা হোসেন। তিনি বললেন, ঢেউটিন বহনের সময় কোনো বস্তা বা ঢাকনা দেওয়া ছিল না। যে কারণে ঢেউটিনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতেন। উপস্থিত বুদ্ধিবলে সামান্য আহত হয়ে বেঁচে গেছেন তিনি। 

এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি) খায়রুল আনাম আবেশ। সম্প্রতি তিনি দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘মোটরসাইকেলে বাজারের ভিতর যাচ্ছিলাম, একজন বিপরীত দিক থেকে ভ্যানে করে জানালার গ্রিল নিয়ে আসছিল। প্রচণ্ড জ্যামে সেই জানালার গ্রিলের ধাক্কায় মোটরসাইকেলসহ পড়ে যাই। তবে অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।’
এ দুজনের মতো ভাগ্য ভালো নয় উপজেলার দৌলতপুরের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. আকবর আলীর (৭০)। তাঁর বাড়ির অদূরেই মাদিলা হাট। ২০১৬ সালের জুলাই মাসের এক সন্ধ্যায় হাট থেকে ফিরছিলেন আকবর আলী। বিপরীত দিক থেকে ভ্যানে করে ঢেউটিন নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন এক ব্যক্তি। সন্ধ্যার আলোআঁধারিতে ভ্যানের টিন ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। ভ্যান কাছে আসতেই চিৎকার করে ওঠেন আকবর আলী। নতুন টিনের আঘাতে ডান পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে। ফিনকি দিয়ে বের হতে থাকে রক্ত। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয় আকবর আলীকে। সেখানে তাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়। পঙ্গুত্ব নিয়েই গত বছরের ২২ ডিসেম্বর মারা যান তিনি। 

এ দুর্ঘটনার পর থেকে পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলে জানান আকবর আলীর একমাত্র ছেলে তৈবুর রহমান লাজু। তাঁর দাবি, এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন যেন আরও তৎপর হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনে আইন করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। 
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ীহাট, মাদিলাহাট, আটপুকুরহাট, বারাইহাট, পুকুরিহাট, খয়েরবাড়ীহাট, মেলাবাড়ীহাট, আমবাড়ীহাট, লক্ষ্মীপুর হাট, আমডুঙ্গিহাট; পাশের বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুরের হাটের সংখ্যা ৫০-৬০টি। প্রতিদিন এসব হাট থেকে ঢেউটিন, অ্যাঙ্গেল, লোহার বার, রড, স্টিলের সিট, স্টিলের পাতি, লোহার দরজা-জানালা কেনাবেচা হয়। এ ছাড়া নানা ওয়ার্কশপে এসব পণ্য তৈরির পর অরক্ষিতভাবেই ভ্যান বা ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে নানা গন্তব্যে পরিবহন করা হয়। বেশির ভাগ লোহার সরঞ্জামের জায়গাই যানবাহনে হয় না, ফলে এমনভাবে বাইরে ছড়িয়ে থাকে যে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়। 

ফুলবাড়ী বাজারের টিন-অ্যাঙ্গেল বিক্রি করেন মেহের এন্টারপ্রাইজের ফিরোজ হোসেন, শাহিন ট্রেডার্সের শাহিনুর রহমান, মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজের রাজু হোসেন। তাদের দাবি, ক্রেতাদের এসব পণ্য পরিবহনের সময় বস্তা বা লাল কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে নিতে বলেন। এতে করে দূর থেকে পথচারীরা দেখতে পাবেন। এসব পরামর্শ কেউ শোনেন, কেউ শোনেন না।
হেরা ট্রেডার্সের মালিক মো. টুটুল ও মা ট্রেডার্সের মালিক অরুণ গুহ লেদু বলেন, টিন, অ্যাঙ্গেল ও লোহার জানালা-দরজা পরিবহনের সময় সতর্ক থাকা উচিত। একটু অসাবধানতার কারণে বড় দুর্ঘটনা হতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকাও থাকা দরকার।
ফুলবাড়ী দোকান ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম আনসারী ও সদস্য সচিব মানিক মণ্ডল এসব পণ্য পরিবহনের ঝুঁকির কথা স্বীকার করেন। তাদের ভাষ্য, দিনের বেলায় সুরক্ষিতভাবেই এসব পরিবহন করা দরকার। প্রশাসনের সুদৃষ্টিও কামনা করেন তারা।

ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় চার দশক ধরে ওয়ার্ডবয় হিসেবে কাজ করছেন মো. তৈমুর আলী। তাঁর ভাষ্য, লোহার অরক্ষিত পণ্য পরিবহনে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে রোগী আসেন। তাদের চিকিৎসায় দিনের বড় একটা সময় যায়। একই হাসপাতালের ব্রাদার রফিকুল ইসলাম মনে করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাবধানতার বিষয়ে কঠোর হলেই এসব দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তারা জানিয়েছেন, টিন বা ধারালো লোহার আঘাত নিয়ে মাসে ১৬০ থেকে ২০০ রোগী আসেন। 
ফুলবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহমুদ আলম লিটন বলেন, লোহার তৈরি এসব পণ্য অরক্ষিতভাবে পরিবহন করা যাবে না। ধারালো অংশ অবশ্যই ঢেকে নিতে হবে।
ইউএনও আহমেদ হাছানের ভাষ্য, এসব পণ্য উন্মুক্ত পরিবহন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে তারা উদ্যোগ নেবেন। কিছু ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তারা ক্রেতা-বিক্রেতাকে সতর্ক করবেন। 

আরও পড়ুন

×