ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঐতিহ্য

একসঙ্গে সাড়ে ছয় হাজার রোজাদারের ইফতার

একসঙ্গে সাড়ে ছয় হাজার রোজাদারের ইফতার
×

রমজান মাসজুড়ে চলে ইফতারের এ আয়োজন। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন থেকে সম্প্রতি তোলা সমকাল

 কিশোর কুমার, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশন প্রাঙ্গণ। ফজরের নামাজের পর সেখানে শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। লক্ষ্য একটাই– প্রতিদিন ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার রোজাদারের জন্য ইফতারি প্রস্তুত করা।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশনে রমজান মাসজুড়ে চলে এই আয়োজন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি দেশের বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইফতার মাহফিল। বিশ্বের বৃহত্তম ইফতার আয়োজন করা হয় পবিত্র কাবা শরিফে। সেখানে রমজান মাসের প্রতিদিন লাখ লাখ রোজাদার একসঙ্গে ইফতার করেন।

কালীগঞ্জ উপজেলার স্থানীয়দের তথ্যমতে, ১৯৩৫ সালে খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (রা.) নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর থেকে প্রতিবছরই রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করতেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরও মিশন কর্তৃপক্ষ এ আয়োজন অব্যাহত রেখেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোজাদাররা একই কাতারে বসে ইফতার করেন। বিশাল এই জমায়েতে বিশৃঙ্খলা নেই, আছে শুধু শান্তির বার্তা।

নলতা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন, নয়নসহ অনেকে জানান, নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশনের ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার রোজাদার ইফতারে অংশ নেন। এখানে ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম– ভেদাভেদ ভুলে সবাই বসেন একই কাতারে। এ যেন শুধু ইফতার নয়; বরং ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য আর আধ্যাত্মিক বন্ধনের এক প্রতিচ্ছবি। এই আয়োজন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইফতার মাহফিল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

তালা উপজেলার খলিষখালী গ্রামের বাসিন্দা শামছুল মোড়ল। ৫৫ বছরের এই ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালান। প্রায় তিন বছর ধরে নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশন প্রাঙ্গণে ইফতার করতে আসছেন শামছুল। তিনি বলেন, আমি গরিব মানুষ। লোকের কাছ থেকে সহযোগিতায় দিন পার করতে হয় আমার পরিবারের। আল্লাহর নামে রোজা রাখি। ভালো কিছু কেনার সামর্থ্য নেই। তাই প্রতিবছর এখানে ইফতার করতে আসি।

নলতা কেন্দ্রীয় আহ্‌ছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, দেশ-বিদেশের ভক্তদের অর্থায়নে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে পরিচালিত হয় ইফতার মাহফিল। ধনী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত সবাই এখানে এককাতারে শামিল হন। নলতা শরিফের এই আয়োজন যেন কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তি নয়; বরং একতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ।
ইফতারসামগ্রী তৈরিতে নিয়োজিত বাবুর্চি আমানত গাজী ও তাঁর সহযোগী আমজাদ আলী বলেন, বিশাল এই আয়োজনে কাজ করছেন প্রায় ৫০ জন দক্ষ বাবুর্চি ও সহকারী। প্রতিদিন এখানে তৈরি হয় ২০০ কেজি ভুনা ছোলা, ১৪৪ কেজি সুজি ও ৬০০ কেজি দুধের ফিরনি। সেই সঙ্গে থাকে শিঙাড়া ও সেদ্ধ ডিম।

স্বেচ্ছাসেবক আরাফাত ইমরান জানান, বিকেল গড়াতেই মাঠজুড়ে হাজারো মানুষের ঢল নামে। এখানে ছোলা, কলা, ফিরনি, শিঙাড়া, খেজুর, চিড়া, ডিমসহ মোট সাত ধরনের খাবার থাকে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করেন তিনিসহ প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক। তারা চারটি ভাগ হয়ে সাজাতে থাকেন ইফতারির থালা।
নলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম জানান, এর আগে ১০ হাজার মানুষের আয়োজন হলেও এখন ৬ থেকে সাড়ে ছয় হাজার মানুষের আয়োজন হচ্ছে। ভক্ত-অনুরাগীরা এগিয়ে এলে বাংলাদেশের বৃহত্তম এই ইফতার আয়োজন আরও বড় পরিসরে করার পরিকল্পনা আছে।

আরও পড়ুন

×