ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঐতিহ্য

আখের গুড়ে পুরান পরিচয়ে ফিরছে বাহেরচর গ্রাম

আখের গুড়ে পুরান পরিচয়ে  ফিরছে বাহেরচর গ্রাম
×

টিনের বড় কড়াইয়ে আখের রস জ্বালিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গুড় সমকাল

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ১২:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাহেরচর গ্রামে ঢুকলেই শোনা যায় আখ মাড়াই যন্ত্রের শব্দ। সড়কের পাশে খোলা জায়গায় ইঞ্জিনচালিত যন্ত্রে বের করা হচ্ছে আখের রস। আরেক দল শ্রমিক সেই রস নিয়ে ঢালছেন পাশের তাফালে (টিনের বড় কড়াই)। তাতে আগুন জ্বালিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গুড়। যেখানে তৈরি, সেখানেই বিক্রি। গ্রামের পাঁচ থেকে সাত স্থানে একই দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিবছর রমজানে এখানকার গুড়ের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে হয় দুই-তিন গুণ।

মানুষের মুখে মুখে বিশুদ্ধ গুড়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় বাহেরচর গ্রামে প্রতিদিন বাড়ছে ক্রেতা। এক সময় আখের গুড়ের জন্য পরিচিত গ্রামটি হারানো ঐতিহ্য নতুনভাবে ফিরে পেতে যাচ্ছে। এলাকার শতাধিক পরিবার জড়িয়েছে এই পেশায়। প্রতিদিন তারা কয়েকশ মণ গুড় তৈরি করেন। কেজি বিক্রি করেন ২০০ টাকা দরে। 

বরিশাল নগরীর সবচেয়ে কাছের উপজেলা বাবুগঞ্জ। সুগন্ধা নদী এ উপজেলাকে বিভক্ত করেছে। নগরীঘেঁষা দক্ষিণ প্রান্তে উপজেলা সদরসহ কয়েকটি ইউনিয়ন। এর মধ্যে কেদারপুর ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের পরিচিতি ভিন্ন কারণে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুল জব্বার খানের বাড়ি এই গ্রামে। তাঁর ছেলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও মেয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জাতীয় রাজনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। 

স্থানীয়রা বলছেন, সুগন্ধার উত্তর তীরের সব গ্রামের জীবিকা কৃষিনির্ভর। আখ চাষ ও গুড় উৎপাদন একসময় এখানকার অন্যতম জীবিকার মাধ্যম ছিল। কৃষিতে অন্য ফসলের দাপটে আখ চাষ প্রায় বিলুপ্ত হতে যাচ্ছিল। গত পাঁচ বছরে আবারও আখ চাষ ও গুড় তৈরিতে ঝুঁকেছেন কৃষক। 

চাষিরা জানিয়েছেন, বাজারে ভেজাল চিনি ও গুড়ে সয়লাব হওয়ায় ভোক্তারা এখন খাঁটি আখের গুড় খুঁজছেন। চাহিদা বেড়ে যাওযায় বাবুগঞ্জের চাষিরা আখ চাষ ও গুড় উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সবচেয়ে বেশি গুড় তৈরি হয় বাহেরচর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে। এ ছাড়া চাঁদপাশা ইউনিয়নেও গুড় তৈরি হয়।

চাষিরা বলছেন, আখের মৌসুম হওয়ায় প্রতিবছর অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত তারা গুড় তৈরি করেন। তবে প্রতি বছর রমজানে চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়। আগে যেখানে প্রতি খলায় দিনে ২০০ কেজি গুড় তৈরি হতো, রমজান শুরুর এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৫০০ কেজির বেশি গুড় তৈরি হয়। 

বাবুগঞ্জ বাজারসংলগ্ন খেয়াঘাটের ওপারে কেদারপুর। সেখান থেকে গ্রামের পাকা সড়কের তিন কিলেমিটার দূরে বাহেরচর গ্রাম। সড়কের পাশেই তৈরি হচ্ছে গুড়। গ্রামের কয়েকজন চাষি মিলে একেকটি জায়গায় গুড় তৈরি করছেন। 

চাষি খোকন শেখ জানান, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে তিনি আবার আখ চাষ শুরু করেছেন। তাঁর দেখাদেখি গ্রামের অন্য চাষিরাও যুক্ত হন। আরেক চাষি সোহেল জানান, গ্রামে আখ চাষ বন্ধ হলে তিনি ঢাকায় গিয়ে বেসরকারি চাকরি করতেন। চার বছর আগে গ্রামে ফিরে পূর্বপুরুষের পেশা আখ চাষ ও গুড় তৈরিতে জড়িয়েছেন। 
এখানকার চাষিদের সহায়তা দিচ্ছে এসডিএফ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা। ২০ জন চাষিকে নিয়ে দল গঠন করে বিনামূল্যে তারা গুড় তৈরির উপকরণ দিচ্ছে। সমিতির সভাপতি নিলু বেগম জানান, দরিদ্র নারীকে গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতে সহায়তা দিতে এ সমিতি গঠিত হয়েছে। সমিতির সদস্য নন, এমন চাষিরাও এখানে আখ এনে গুড় তৈরি করতে পারবেন।

চাষি নুরুল ইসলাম জানান, তৈরি গুড় কয়েক বছর স্থানীয়ভাবে বিক্রি হচ্ছিল। এ বছর কয়েকটি অনলাইন বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অর্ডার দিয়েছে। 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, বরিশালে সবচেয়ে বেশি আখ চাষ হয় বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউনিয়নে। এ বছর উপজেলায় ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। 
 

আরও পড়ুন

×