ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘রানবার চাল নাই- গরুর খাওন কই থেইক্কা দিমু, এর লাগি কম টেহাই বেইচ্চা দিছি’

মিঠামইনে গো-খাদ্যের সংকট, কম দামে গরু বিক্রি করছেন কৃষকরা

‘রানবার চাল নাই- গরুর খাওন কই থেইক্কা দিমু, এর লাগি কম টেহাই বেইচ্চা দিছি’
×

ছবি: সমকাল

মিটামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১৮:৫৬ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১৯:০৪

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার প্রভাব এখন পড়েছে কৃষকদের গোয়ালঘরে। বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামে ধানের পাশাপাশি গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য খড় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। খাদ্যের অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করছেন।

মিঠামইন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা পচে যাওয়া ধান ও খড় শুকিয়ে কোনোমতে সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে অধিকাংশ খড় পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বছরের বাকি সময় গরুকে কী খাওয়াবেন, সেই দুশ্চিন্তায় অনেক কৃষক আগেভাগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

হেমন্তগঞ্জ গ্রামের কৃষক সজিব মিয়া বলেন, ‘ধান তো গেলই, খড়ও রইল না। গরু রাখলে খাওয়াবো কী? তাই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করছি।’ তিনি জানান, প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।

একই উপজেলার রানীগঞ্জ গ্রামের কৃষক সোহাগ মিয়া বলেন, ‘সারাবছর লাভের আশায় গরু পালন করি। কিন্তু এবার খড় না থাকায় গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। একসঙ্গে অনেক কৃষক গরু বিক্রি করতে আসায় বাজারেও দাম কমে গেছে।”

কৃষক মমিন মিয়ার স্ত্রী জামেলা বলেন, ‘মাদানে রানবার চাল নাই ঘরো, গরুর খাওন কই থেইক্কা দিমু, এর লাগি কম টেহাই গরু বেইচ্চা দিছি।’ ৩ খের জমির মধ্যে ১ খের ২৮ শতাংশ ডুইব্বা গেছে। হেই জমির খড় পইচ্চা গেছে। এই খড় গরু ও খাইবো না। ৯০ হাজার টেহা দামের ৩ ডা গরু ৬০ হাজার টেহায় বেইচ্চে আমার জামাই। খালি আমরার না অনেকের এ অবস্থা।’

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে সংগ্রহ করা খড় দিয়েই সাধারণত সারা বছরের গবাদিপশুর খাদ্যের বড় অংশের চাহিদা পূরণ হয়। কিন্তু এবার আগাম বন্যায় সেই খড় নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। কেউ সংসারের খরচ চালাতে, আবার কেউ গো-খাদ্যের সংকটের আশঙ্কায় গরু বিক্রি করছেন।

মিঠামইন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মানিক মিয়া বলেন, ‘হাওরপাড়ের অনেক কৃষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ নৌকায় করে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। গরু পালন চালিয়ে যাওয়া এখন কৃষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।’

মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি নাজমুল হাসান ভুইয়া বলেন, ‘বর্তমানে গো-খাদ্যের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে গরু ধরে রাখলে আরো লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ঠিকমত খাবার না পেলে গরুর ওজন কমে যাবে এবং পরবর্তীতে আরো কম দামে বিক্রি করতে হবে।’

এ বিষয়ে মিঠামইন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. হিজেল মাহমুদ বলেন, ‘উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার টন গো-খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে উপজেলায় ৯ হাজার ১১টি গরু প্রস্তুত রয়েছে। তবে গো-খাদ্যের সংকট অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×