ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

মা দিবসে মা ও সদ্যোজাত বোন হারালো রুপু

মা দিবসে মা ও সদ্যোজাত বোন হারালো রুপু
×

স্বামী রূপম দাস ও মেয়ে রুপুর সঙ্গে জয়ন্তী হালদারের (মাঝে) ছবিটি এখন স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

কেএম আজাদ রহমান, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ২১:০২

ঘুরে ঘুরে গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত পরামর্শ দিতেন জয়ন্তী হালদার (২৮)। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় পরিবার কল্যাণ সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই নারী শনিবার নিজ ঘরেই অচেতন হয়ে পড়েন। গোঙানির শব্দ শুনে আসেন শাশুড়ি দেবযানী দাস। তাঁর চিৎকারে স্বজনেরা দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে জয়ন্তীকে নিয়ে যান আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে (শেবাচিম)। পরদিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম দেন মেয়েশিশুর। কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান জয়ন্তী। বাঁচানো যায়নি শিশুটিকেও। 

মর্মান্তিক এই ঘটনায় মুষড়ে পড়েছেন জয়ন্তীর স্বজনেরা। তিনি উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের রূপম দাসের স্ত্রী। রূপম পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। এ দম্পতির বড় মেয়ে রূপান্তিকা দাস রুপু (৯) আগৈলঝাড়া সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। 

রোববার রাত ৮টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে যখন জয়ন্তীর মরদেহ ফুল্লশ্রী গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে আনা হয়, তখন কান্না থামছিলো না রূপান্তিকার। বাড়িতে তখন শত মানুষের ভিড়। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সেই ভিড়ে যেন সদ্য হারানো মায়ের মুখ খুঁজছিলো শিশুটি। 

স্বজনেরা জানায়, শনিবার রাত ১০টার দিকে গোঙানির শব্দ পেয়ে জয়ন্তীকে অচেতন দেখতে পান তাঁর শাশুড়ি দেবযানী দাস। স্বামী দেবানন্দ দাস ও পরিবারের অন্যদের সহায়তায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা জয়ন্তীকে নিয়ে যান আগৈলঝাড়া হাসপাতালে। ততক্ষণে রাত ১১টা বেজে গেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বদরুল আলম বলেন, শনিবার রাতে অচেতন অবস্থায় জয়ন্তী হালদারকে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। তাঁর একলাম্পশিয়ার লক্ষণ দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বরিশাল শেবাচিমে রেফার করেন। 

এদিন গভীর রাতে শেবাচিমে ভর্তির পর দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টায়ও জ্ঞান ফেরেনি জয়ন্তী হালদারের। চিকিৎসকেরা দ্রুত সময়ের মধ্যে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। রোববার যখন বিশ্ব মা দিবসের কর্মসূচি চলছিলো, সেদিন দুপুর দুইটায় অস্ত্রোপচার করে মেয়েশিশুর জন্ম দেন চিকিৎসকেরা। পরে জয়ন্তীর অবস্থার আরও অবনতি হয়। সদ্যোজাত মেয়েসহ তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জয়ন্তী।

কুয়াকাটা থেকে মুমূর্ষু স্ত্রীর পাশে ছুটে এসেছিলেন রূপম দাস। তিনিই অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে ফেরেন ফুল্লশ্রী গ্রামের বাড়িতে। সেখানে তখন স্বজনের গগনবিদারী আর্তনাদ। ভিড় করে আসা স্বজন-প্রতিবেশীকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।

জয়ন্তীর ভগ্নিপতি অমল সরকার বলেন, ‘জয়ন্তীর অসুস্থাতার খবরে শুরুতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। পরবর্তীতে বরিশাল শেবাচিমে নিয়ে গেছি। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। গভীর রাতে মারা যায় নবজাতকও। বহু চেষ্টা করেও তাদের বাঁচাতে পারি নাই।’

রোববার রাত ২টার দিকে বাড়িতেই দাহ করা হয় জয়ন্তীকে। এরই মধ্যে সবাই জেনে গেছেন, শেবাচিমে চিকিৎসাধীন নবজাতকও নেই। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে আনা হয় রাত তিনটার দিকে। পরে সমাহিত করা হয় শিশুটিকে। স্বজন হারানোর শোকে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। বারবার জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছা যাচ্ছেন রূপম। সোমবার জানা যায়, তিনি স্ত্রী-কন্যা হারানোর শোকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কারও সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় নেই।

জয়ন্তী হালদারের বাবা ইন্দ্রজিৎ হালদার সোমবার রাতে বলেন, ‘আমার মেয়েটা মারা যাওয়ায় নাতনি রুপান্তিকা মাতৃহারা হয়ে গেলো। আমরা শিক্ষাসহ যেকোনো বিষয়ো দায়িত্ব পালন করবো। তবে মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা তো কখনো পূরণ করতে পারবো না।’
 

আরও পড়ুন

×