ঐতিহ্য
উলিপুরের ক্ষীরমোহন
কুড়িগ্রামের উলিপুরের একটি দোকানে তৈরি হচ্ছে ‘ক্ষীরমোহন’। সম্প্রতি তোলা সমকাল
মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১০:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিষ্টান্নবিলাসী মানুষের কাছে প্রিয় নাম ক্ষীরমোহন। কুড়িগ্রামের উলিপুরের এই মিষ্টির সুখ্যাতি এখন শুধু দেশে নয়; বিদেশেও ছড়িয়েছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা প্রান্তে আছে এ মিষ্টির নামডাক। এটি উলিপুরের আদি মিষ্টি না হলেও ষাটের দশকের শুরুতে ক্ষীরমোহন তৈরি ও বিপণন শুরু হয়। ওই সময় একটি ক্ষীরমোহনের দাম ছিল মাত্র ছয় আনা। তবে এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ক্ষীরমোহন কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। এ কারণে তখন মিষ্টান্নটি ততটা জনপ্রিয়তা পায়নি।
আশির দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর জনপ্রিয়তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কথিত আছে, ব্রিটেনের মহারানী এলিজাবেথও এই মিষ্টি খেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ থেকে সুধীর সরকার নামে এক মিষ্টির কারিগর উলিপুরে এসে চাকরি নেন কছির মিয়ার রেস্টুরেন্টে। তাঁর চাকরির শর্ত ছিল, তিনি এমন একটি ভিন্নধর্মী মিষ্টি তৈরি করবেন, যাতে তাঁর দোকানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তিনি মালিকের শর্তে রাজি হন। কয়েক দিন সময় নিয়ে তৈরি করেন ক্ষীরমোহন। প্রথম দিনেই বাজিমাত উলিপুর। পরে তাঁর দেখাদেখি উলিপুরের প্রখ্যাত কারিগর মনমোহন হালাই তৈরি করেন ক্ষীরমোহন। ওই সময় আওয়ামী লীগ নেতা কানাই লাল সরকার মনমোহন হালাইয়ের কাছ থেকে তৈরি করে নেন ক্ষীরমোহন। পরে তা উপহার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু সেই সময় ক্ষীরমোহন খেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেই থেকে কুড়িগ্রামে দেশি-বিদেশি অতিথি এলে তাদের খাবার টেবিলে বিশেষ খাবার হিসেবে ক্ষীরমোহন দেখা যেত।
উলিপুরের চরাঞ্চলের ঘাস ও নানা প্রাকৃতিক গোখাদ্য খেয়ে বেড়ে ওঠা গাভির খাঁটি দুধের ছানা থেকে তৈরি ক্ষীরমোহন স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। কারিগর মো. আল আমিন বলেন, খাঁটি ছানার তৈরি মিষ্টি প্রথমে গরম চিনির রসে জ্বাল দেওয়া হয়। মিষ্টি হয়ে এলে তা থেকে রস ঝরিয়ে দুধে জ্বাল দেওয়া হয়। দুধ ক্ষীরে পরিণত হওয়ার পর মিষ্টির ভেতরে তা ঢুকে লালচে রং ধারণ করলেই তৈরি হয় ক্ষীরমোহন। এক মণ দুধ থেকে ১৫ থেকে ২০ কেজি ক্ষীরমোহন হয়। এখন দেশে-বিদেশে উলিপুরের নাম নেওয়ার আগেই ক্ষীরমোহনের নাম নেন। জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের তালিকায় ক্ষীরমোহনের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
উলিপুরে ওকে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, পাবনা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মেজবান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, আল স্বাদ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, আল আমিন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মৌসুমী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টসহ ১০টি রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ মণ ক্ষীরমোহন বিক্রি হয়। প্রতি পিস ৪০ টাকা। ৪০০ টাকা কেজি হিসাবে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে মাসে ৪৮ লাখ এবং বছরে পাঁচ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ক্ষীরমোহন বিক্রি হয় বলে রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এর মধ্যে উলিপুরের সুপরিচিত ওকে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক মো. শামছুল আলম বলেন, আমি প্রতিদিন ১২০ কেজি ক্ষীরমোহন বিক্রি করি।
- বিষয় :
- ঐতিহ্য
