ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

শিশুকে হামের টিকা দিতে হয়, জানেন না অনেকে

শিশুকে হামের টিকা দিতে হয়, জানেন না অনেকে
×

বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১০:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর বিচ্ছিন্ন জনপদ চরমোন্তাজ ইউনিয়ন। দুর্গম এই এলাকায় ৯ মাস বয়সী শিশু তানহা হামে আক্রান্ত হলে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে (শেবাচিম) ভর্তি করা হয়। জন্মের পর শিশুকে বিভিন্ন রোগের টিকা দিতে হয়, তা জানতেন না তানহার মা রাবেয়া বেগম। তাই তানহাকে কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। গত রোববার হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে সমকালকে এভাবেই বলছিলেন রাবেয়া। 

ওই দিন হামে আক্রান্ত ১৯৬ শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিল। কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ শিশুর পরিবার প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করে। অনেক শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। আবার অনেকের হামের টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়স, অর্থাৎ ৯ মাসও হয়নি।

গত ১৩ মে পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যুর একটি তালিকা সমকালের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, হাম ও এর উপসর্গে ৩৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম। 

 অসচেতনতা অন্যতম কারণ 
আগে থেকেই চিকিৎসকরা বলে আসছেন, অভিভাবকরা মুমূর্ষু অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে আনছেন। তখন চিকিৎসা দিয়েও রোগী বাঁচানো যায় না। ৩৭ শিশু মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছে ১৬ শিশু। এদের সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নের তানহার স্বজনের সঙ্গে কথা বললে অসচেতনতার প্রমাণ মেলে। শিশুটির নানি আলেয়া বেগমের ভাষ্য, অন্তত এক মাস আগে তানহা জ্বরে আক্রান্ত হয়। থেমে থেমে জ্বর আসত। পল্লিচিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়। এতে ভালো না হওয়ায় প্রথমে তাকে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। আট দিন পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে তানহা। আবারও জ্বরে আক্রান্ত হলে নেওয়া হয় পটুয়াখালী হাসপাতালে। সেখানে অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হয়। 
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশু আলিমের পরিবার থাকে বরিশাল নগরীর পলাশপুরে। শিশুটি মা জানায়, সাত দিন ধরে আলিম জ্বরে ভুগছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাম নিশ্চিত হওয়ায় এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ১১ মাস বয়সী আলিমকেও হামের টিকা দেওয়া হয়নি। তার মায়ের ভাষ্য, টিকা দিতে গিয়েছিলেন। টিকা নেই জানিয়ে কেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একই কথা ছয় মাস বয়সী আহমেদের মা ফাইজা আক্তার জুঁইয়েরও। ভোলা শহর থেকে এসেছেন তারা। 

ভোলার দৌলতখানের দক্ষিণ জয়নগর গ্রামের তিন বছরের শিশু মিম গত ৩০ এপ্রিল ভোলা সদর হাসপাতালে মারা গেছে। তার নানি বিউটি বেগম জানান, অসুস্থ হওয়ার প্রায় এক মাস পর মিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে বাড়িতে রেখে হুজুর দিয়ে ঝাড়-ফুঁক ও পানি পড়া খাওয়ানো হয়। মিমকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তার নানি। 
টিকা পাওয়ার পরও হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ব্যাপারে হাসপাতালটির সহযোগী অধ্যাপক ডা. স্বপন কুমার হালদার বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা দেওয়ার পর ৭০ শতাংশের শরীরে যথাযথ কাজ করে। বাকিদের শরীরে অন্য জটিলতা থাকায় টিকা দেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার গত শনিবার শেবাচিম হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তখন উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। এর আগে তারা বুকের দুধ খায়, যা থেকে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরি হয়। তিনি দাবি করেন, বেশির ভাগ আক্রান্ত শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হয়নি। এসব অভিভাবক সন্তানকে কৌটার দুধ খাওয়ান। 

আইসিইউ সংকট 
শেবাচিম হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ঢুকে চিকিৎসাধীন অনেক শিশুর মুখে প্লাস্টিকের হেডবক্স লাগানো দেখা যায়। শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুর অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে এ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অথচ এমন মুমূর্ষু রোগীর জন্য আইসিইউ অপরিহার্য।
ওয়ার্ডের সেবিকারা জানান, এ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ১০টি। এখানে তাৎক্ষণিক আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায় না। তাই বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিকের হেডবক্স ব্যবহার হচ্ছে। এ কৌশলে সব শিশুর জীবন রক্ষা হচ্ছে না। গত ১৪ মে আফিয়া নামে একজন আইসিইউ সংকটের কারণে মারা গেছে। এ ছাড়া ৪৮ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রতিদিন দ্বিগুণ শিশু ভর্তি থাকছে। 

আরও পড়ুন

×