ঐতিহ্য
স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি- সমকাল
জিয়াউর রাশেদ, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। এই জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় বাংলার জমিদারি ঐশ্বর্য, স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি। বিশাল এই প্রাসাদ অনেক ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও পর্যটকের কাছে অন্যতম আগ্রহের বিষয়। সময়ের পরিক্রমায় প্রাসাদটি এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেটি ‘সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয় প্রবীণদের তথ্যমতে, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন হয় ১৮৮৯ সালে, রামরতন ব্যানার্জির হাত ধরে। তিনি নাটোর এস্টেটের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। কর্মদক্ষতার কারণে অল্প সময়েই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। পরে মুড়াপাড়ায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
ইতিহাস-গবেষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, রামরতন ব্যানার্জি মূল ভবনের ভিত্তি ও প্রাথমিক কাঠামোর কাজ শুরু করেন। পরে তাঁর ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জি ভবনটি সম্প্রসারণ করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রাসাদে রূপ দেন।
প্রবীণ বাসিন্দা হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি, এই ভবনের নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে চুন-সুরকি ও বিশেষ ধরনের ইট আনা হয় কলকাতা থেকে। ভবনের কিছু অলংকরণ সামগ্রী নাকি ভারতীয় কারিগরদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল।’
প্রাসাদটির স্থাপত্যশৈলীতে ইউরোপীয়, মোগল ও উপমহাদেশীয় নকশার প্রভাব স্পষ্ট। বিশাল খিলান, উঁচু স্তম্ভ, লম্বা বারান্দা, কারুকাজ করা জানালা ও অলংকৃত দেয়াল দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। লাল ও সাদা রঙের সমন্বয়ে তৈরি ভবনটির প্রতিটি অংশেই রাজকীয় সৌন্দর্যের ছাপ রয়েছে।
প্রাসাদটিতে ৯৫টি কক্ষ রয়েছে। এ ছাড়া ছিল নাচঘর, পূজামণ্ডপ, অতিথিশালা, বৈঠকখানা, কাচারিঘর ও ভান্ডারঘর।
ভবনটির সামনের দিকে রয়েছে বড় একটি পুকুরে দুটি সুদৃশ্য বাঁধানো ঘাট আছে। ঘাটগুলোর স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। দীর্ঘ সময় পার হলেও পুরোনো ইট, সিঁড়ি ও ঘাটের কাঠামোতে জমিদারি আমলের ছাপ স্পষ্ট।
ভবনের পশ্চিম পাশে রয়েছে আরও একটি বড় পুকুর। পুকুরে রয়েছে বড় একটি বাঁধানো ঘাট, যা বিশেষভাবে জমিদার পরিবারের নারীরা ব্যবহার করতেন। সেই ঘাটও অতিত ঐতিহ্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহফুজুল করিম বলেন, ‘মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি শুধু একটি ভবন নয়, এটি বাংলার সামাজিক ইতিহাসের অংশ। এ ধরনের স্থাপনা আমাদের অতীতের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।’
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ড. শারমিন আক্তার বলেন, ভবনের স্থাপত্যশৈলীতে যে নান্দনিকতা রয়েছে, তা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যথাযথ সংস্কার না হলে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর মিয়া বলেন, ‘আগে ভবনটির সৌন্দর্য আরও বেশি ছিল। এখন অনেক জায়গায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে।’
দর্শনার্থী নুসরাত জাহান বলেন, এখানে এসে মনে হয়, প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের মধ্যে চলে এসেছি। জায়গাটি অত্যন্ত সুন্দর।
দেশভাগ ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ধীরে ধীরে জমিদার পরিবারের প্রভাব কমে আসে। ভবনের বিভিন্ন অংশে এখন ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও কোথাও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।
রূপগঞ্জ সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি কামরুল ইসলাম বলেন, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি ঘিরে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
- বিষয় :
- ঐতিহ্য
