কালিতলা হাটে প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা
লিচুর বৃহত্তম পাইকারি বাজার দিনাজপুরের কালিতলা নিউমার্কেটে এখন প্রতিদিন বসছে হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার মিলন মেলা সমকাল
দিনাজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাদ, গন্ধ ও মিষ্টতার অনন্য সমন্বয়ে দিনাজপুরের লিচু বরাবরই দেশের ফলপ্রেমীদের কাছে আলাদা কদর পেয়ে এসেছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া বেদানা লিচু ঘিরে এবারও জমে উঠেছে জেলার লিচুর বাজার। তবে চাষিদের মুখে হাসি থাকলেও রয়েছে আক্ষেপ। ফলন কমেছে, দামও প্রত্যাশামতো বাড়েনি।
দেশের বৃহত্তম লিচুর পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর শহরের কালিতলা নিউমার্কেটে এখন প্রতিদিন বসছে হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলা। কৃষক, বাগান মালিক, আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর এই বাজারে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের আশা, চলতি মৌসুমে জেলায় ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্য হবে।
লিচুর শহরে উৎসবের আমেজ
ভোরের আলো ফোটার আগেই সদর, বিরল, চিরিরবন্দর, কাহারোলসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত ভ্যান ও ইজিবাইকে লিচু আসে কালিতলার বাজারে। সারাদিন দরদাম শেষে এসব লিচু ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দেশের বাইরেও যাচ্ছে দিনাজপুরের লিচু।
বর্তমানে বাজারে বেদানা লিচু প্রতি শ ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চায়না থ্রি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, বোম্বাই ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং হাড়িয়া ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোলাপি ও মোজাফফরী জাতের লিচুর দাম প্রতি শ ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা।
ঢাকার বনানী থেকে বেড়াতে আসা সুমি আক্তার বলেন, ‘দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ নিয়ে অনেক শুনেছি। বাজারে এসে কিনলাম, খেয়েও দেখলাম। সত্যিই অনেক মিষ্টি ও সুস্বাদু।’ শহরের সুইহাড়ী এলাকার বাসিন্দা রিপন চন্দ্র বলেন, ‘এবার দাম তুলনামূলক নাগালের মধ্যে। তাই চার জাতের ২০০টি লিচু কিনেছি।’
ঢাকার ব্যবসায়ী ফিরোজুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ ক্যারেট লিচু ঢাকায় পাঠান তিনি। তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরের লিচুর আলাদা সুনাম আছে। তবে এবার বিভিন্ন জেলায় লিচুর উৎপাদন বেড়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কম।’
অন্যদিকে ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মনে করেন, বাজারে এখন সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কম। কয়েকদিন পর সরবরাহ কমলে দাম বাড়তে পারে। তখন ক্রেতাদের মুখে হাসি ফুটবে।
আবহাওয়ার ধাক্কায় কমেছে উৎপাদন
তাপমাত্রার তারতম্য ও কালবৈশাখীর কারণে এবার লিচুর ফলন কম হওয়ায় লাভ নিয়ে শঙ্কায় আছেন চাষিরা। বিরল উপজেলার মাধববাটী এলাকার লিচুচাষি রহিম উদ্দিন বলেন, তাঁর ৫০টি গাছের মধ্যে অর্ধেক বোম্বাই ও মাদ্রাজি, বাকিগুলো বেদানা। এবার বেদানার ফলন আশানুরূপ হয়নি। তিনি বলেন, ‘মুকুল অনেক এসেছিল। সেই তুলনায় ফল ধরেনি। বোম্বাই ও মাদ্রাজির ফলন ভালো হলেও বাজারদর কম। ফলে লাভের অঙ্কটা কমে গেছে।’
সদরের উলিপুর এলাকার চাষি রিয়াজুল ইসলামও একই সুরে বলেন, ‘দিনাজপুরের লিচুর চাহিদা সবসময় ভালো। এবার ফলন কম আর দামও প্রত্যাশামতো নয়। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হবে।’
তবে মাসিমপুর এলাকার বাগান মালিক আজগার আলী বলছেন, ‘এবার ফলন কিছুটা কম হলেও লিচু ফেটে যাওয়ার সমস্যা কম ছিল। ফলে যা ধরেছে, তা ভালোভাবে টিকে আছে।’
দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. এজামুল হক বলেন, চলতি বছর প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। প্রচুর মুকুল এলেও তাপমাত্রার তারতম্য ও কালবৈশাখীর কারণে পরাগায়ন ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক ফল ঝরে গেছে।
তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় ফলন কম হয়েছে। তবে বাজার ভালো রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া বেদানা লিচু দিনাজপুরের ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এবারও ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্যের আশা করছি।’
- বিষয় :
- লিচু
