দস্যুদের টোকেন দেখিয়ে শিকার চলছে সুন্দরবনে
শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা)
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হিসেবে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে জেলে-বাওয়ালিসহ সবার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। পেশাজীবীরা বনে না যাওয়ায় এই সময়ে দস্যুতা থাকার কথা নয়। কিন্তু বন্ধের সময়েও সুন্দরবনে সক্রিয় আছে কয়েকটি দস্যুদল। তাদের নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করে অনেকেই অবৈধভাবে শিকার করতে বনে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে গত ২৬ জুন কোস্টগার্ডের সঙ্গে একটি দস্যুদলের সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনার পর সুন্দরবনকেন্দ্রিক পেশাজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন জেলের সঙ্গে গত কয়েক দিনে কথা হয় সমকালের। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনে ১০টি দস্যুদল তৎপর। এর মধ্যে বেশি সক্রিয় বাহিনীগুলো হলো– দুলাভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, করিম-শরীফ বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী। এর মধ্যে সম্প্রতি কোস্টগার্ড দুলাভাই বাহিনী প্রধান রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে; তবে তাঁর দলের অন্য সদস্যরা সক্রিয়।
জেলেরা জানিয়েছেন, প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার গোন হিসাব করে মাসে দুইবার এসব বাহিনীকে নৌকাপ্রতি ৬-৭ হাজার টাকা করে দিতে হয়। এর বিনিময়ে যে টোকেন দেওয়া হয়, সেটি দেখিয়ে বনে অবৈধভাবে মাছ-কাঁকড়া শিকার করেন জেলেরা। এই সময়ে দস্যুদলের টোকেন ছাড়া বনে যাওয়া অসম্ভব। অনেক জেলে সুন্দরবন-সংলগ্ন লোকালয়ের পাশে নদীতে চিংড়ির রেণু আহরণ করে থাকেন। তাদেরও এখন মাসোহারার আওতায় নিয়েছে দস্যুরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধের সময় আগের তুলনায় সুন্দরবনে যাওয়া পেশাজীবী সংখ্যা কমলেও মাছ-কাঁকড়া আহরণ বাড়ছে। প্রজনন মৌসুমে সাগর থেকে মাছ ও কাঁকড়া সুন্দরবন-সংলগ্ন ছোট খাল ও নদীতে উঠে আসায় তারা সহজেই শিকার করতে পারেন। এমনকি এই সময়ে বিষ দিয়ে মাছ শিকারও বাড়ে। অবৈধভাবে শিকারে দস্যুরা সহায়তা করে বলে বন বিভাগের অসহায়ত্ব তুলে ধরেন একাধিক কর্মকর্তা। তারা দস্যুতা ও অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে যৌথ অভিযানের দাবি জানান।
কোস্টগার্ড ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জুন রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলারচর গ্রামের পাশে সুন্দরবনের বেশোখাল এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র সঙ্গে কোস্টগার্ড সদস্যদের গোলাগুলি হয়। কোস্টগার্ডের দাবি, ওই অভিযানে একজন নিহত হন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম ও ইসরাফিল হাওলাদারকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের কয়রা স্টেশনের পেটি অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে কয়রা থানায় দুটি মামলা করেন।
নেপথ্যে মহাজনরা
বন্ধ মৌসুমে সুন্দরবনে বনদস্যুদের টিকিয়ে রাখার পেছনে ‘মহাজন’ নামধারী কিছু মাছ ব্যবসায়ীর হাত রয়েছে। এমন তথ্য দেন সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবক দল কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) কয়েকজন সদস্য। তারা বলছেন, এসব অসাধু মহাজন সুন্দরবনের খাল ও নদী নিয়ন্ত্রণে রাখতে দস্যুদের ব্যবহার করেন। তারা লোকালয়ে বসে দস্যুদের টোকেন বাণিজ্য পরিচালনা করেন। এমনকি দস্যুদলের এলাকাও ভাগ করে দেন তারা। প্রতিটি দস্যুদল আলাদা টোকেন ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে দশ টাকা ও দুই টাকার নোট বেশি ব্যবহার হয়। এ ছাড়া দস্যুদলের নাম ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরসহ ভিজিটিং কার্ডও রয়েছে বলে জানা গেছে।
উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার সময় সাধারণ জেলেরা যেতে পারেন না। তবে এলাকার প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ীরা শ্রমিক ভাড়া করে বনদস্যুদের সাহায্যে অবাধে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করেন। এ ছাড়া এলাকার সাধারণ মানুষও কম পরিশ্রমে বেশি টাকা আয়ের লোভে বনদস্যুদের কাছ থেকে টোকেন নিয়ে মাছ শিকার করেন। এসব মাছ প্রশাসনের নাকের ডগায় স্থানীয় আড়তে বিক্রি হয়। তাঁর অভিযোগ, সুন্দরবনে নতুন করে দস্যুবৃত্তি শুরুর পেছনে মাছ ব্যবসায়ীরা মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন। তাদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় প্রশাসনের কিছু লোক, রাজনীতিবিদ ও কথিত সাংবাদিক নেতারা।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১ জুন নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর গতকাল সোমবার (২৯ জুন) পর্যন্ত তাদের অভিযানে ২ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১১টি। এ ছাড়া অবৈধভাবে গড়ে তোলা শুঁটকির ১০টি চাতাল ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন থেকে দস্যুতা নির্মূলে যৌথ অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরেন সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, সুন্দরবনের অনেক গহিনে কিছু টহল ফাঁড়ি রয়েছে। তাদের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে অনেক সময় বনদস্যুদের এড়িয়ে যেতে হয়। তবে বনদস্যুদের অবস্থান সম্পর্কে নিয়মিত কোস্টগার্ডকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন।
বনদস্যুদের ধরতে সবার সহায়তা চান কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, বনদস্যু নির্মূলের পাশাপাশি বনজীবী, জেলে ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে অভিযান চলছে। বন থেকে দস্যু নির্মূলে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনবেন তারা।
- বিষয় :
- সুন্দরবন