ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

প্রতারণা করে সরকারি জলমহাল ইজারা

প্রতারণা করে সরকারি জলমহাল ইজারা
×

চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর নাম ও কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অন্য উপজেলায় সরকারি জলমহাল ইজারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের দাবি, তাদের অজান্তেই গোদাগাড়ী, বাগমারা ও বাঘা উপজেলায় ২৬টি জলমহালের জন্য তাদের সমিতির নাম ব্যবহার করা হয়েছে। 
চারঘাট উপজেলার সাহাপুর মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো. শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমাদের সাহাপুর সমিতির কাগজ দিয়ে গোদাগাড়ী ও বাগমারায় চারটি পুকুর নেওয়া হয়েছে। আমরা কিছুই জানি না। চারঘাটের সব সমিতির কাগজ উপজেলা সমবায় অফিস, ভূমি অফিস ও উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির নেতা হাবিবুর রহমানের কাছে রয়েছে। এ তিনটি জায়গাকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে আমরা মনে করছি।’

মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী বলেন, ‘আমাদের সমিতির কোনো সভায় অন্য উপজেলায় জলমহাল নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। তারপরও কীভাবে আমাদের কাগজ ব্যবহার হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এ কাজে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’ 

এর আগে গত বছর একই কৌশলে তানোর উপজেলায় চারটি জলমহাল ইজারা নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ইজারার অর্থ পরিশোধ না করায় চারঘাটের দুটি মৎস্যজীবী সমিতির নামে নোটিশ জারি হয় এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধান হয়। একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটায় উদ্বেগ বেড়েছে সমিতির নেতাদের মধ্যে।
একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটায় প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন প্রকৃত জেলেরা। তারা বলছেন, একটি চক্র তাদের সমিতির নাম ব্যবহার করে কোটি টাকার জলমহাল ইজারা নিয়ে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। ইজারার অর্থ পরিশোধ না হলে মামলা, নোটিশ ও প্রশাসনিক জটিলতার দায় এসে পড়বে নিবন্ধিত সমিতির ওপর। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জালিয়াতির আশঙ্কা করছেন তারা।

উপজেলা মৎস্য অফিস ও জেলা মৎস্যজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট উপজেলায় ১ হাজার ৩৭৪ জন জেলেকে নিয়ে ১১টি নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমিতি রয়েছে। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী একটি সমিতি সর্বোচ্চ দুটি জলমহাল ইজারা নিতে পারে। চারঘাটের সমিতিগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের উপজেলায় দুটি করে জলমহাল ইজারা নিয়েছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী অন্য উপজেলায় নতুন করে জলমহালের জন্য আবেদন কিংবা ইজারা নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বিভিন্ন উপজেলার ইজারা-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, চারঘাটের চন্দনশহর, রাওথা, সাহাপুর, চকমোক্তারপুর, গোপালপুর, পশ্চিমপাড়া ও তালবাড়িয়া মৎস্যজীবী সমিতির নামে গোদাগাড়ী উপজেলায় ১২টি এবং বাগমারা উপজেলায় আটটি জলমহাল ইজারা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে বাঘা উপজেলায় আরও ছয়টি জলমহালের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

মেরামতপুর মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য খাইরুল ইসলাম জানান, গোদাগাড়ী ও বাগমারায় চারঘাটের সমিতিগুলোর নামে নেওয়া ২০টি জলমহালের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু লোকের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় অনিয়ম সম্ভব নয়। তাই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
চারঘাট জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অন্য উপজেলার সমিতিকে জলমহাল দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা সমবায় অফিস থেকে প্রত্যয়ন নেওয়ার বিধান রয়েছে। কাজেই সমবায় অফিসের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা ঘটানো কঠিন। গত বছরও একইভাবে জেলে সমিতিগুলোকে বিপদে ফেলা হয়েছিল। এবারও একই কায়দায় আরও বড় পরিসরে জেলেদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চারঘাট উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির নেতা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাকে জড়িত করে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা; বরং সমিতিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আমি গোদাগাড়ীতে গিয়ে ইজারা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছি।’
উপজেলার চকমোক্তারপুর মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, ‘পুকুরের ইজারা বাতিল করতে গিয়ে বাগমারার সিহাব হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, বিভিন্ন ব্যক্তিকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন। বাগমারা সমবায় অফিসের সহকারী পরিদর্শক শ্যামল কুমারও এর সঙ্গে জড়িত আছেন।’ আক্ষেপ করে আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাগজ ব্যবহার করে চক্রটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন আমরা মাছ ধরা বাদ দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করতে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছি।’

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারার সিহাব হোসেন বলেন, ‘সবাইকে খুশি করেই কাগজ নিয়েছি।’ তবে কারা সুবিধা পেয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কারও নাম বলতে রাজি হননি। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে যোগাযোগ করা হয় বাগমারা উপজেলা সমবায় অফিসের সহকারী পরিদর্শক শ্যামল কুমারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর চারঘাট সমবায় অফিসের মাধ্যমে জেলেদের অবহিত করেছি। আর সিহাব হোসেন নামে আমাদের এলাকার যাঁর কথা বলা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চারঘাট উপজেলা সমবায় অফিসে যোগাযোগ করা হয়। সমবায় কর্মকর্তার পদ বর্তমানে শূন্য। দায়িত্ব পালন করছেন রাজশাহী জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। তিনি বলেন, ‘মৎস্যজীবী সমিতির কাগজ ব্যবহার করে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সব উপজেলায় বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মহিনুল হাসান বলেন, ‘মৎস্যজীবী সমিতি লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে জাল কাগজপত্র বা প্রতারণার মাধ্যমে জলমহাল ইজারা নেওয়ার প্রমাণ যদি পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ইজারা বাতিলের পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
 

আরও পড়ুন

×