এক দিনও চলেনি সোয়া ৫ কোটি টাকার প্লান্ট
খুলনায় বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন
খুলনায় তিন বছর বন্ধ থাকায় আগাছায় ভরে গেছে কম্পোস্ট প্লান্ট ও তেল উৎপাদন কেন্দ্র-সমকাল
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন এবং কম্পোস্ট সার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে খুলনা নগরীর মাথাভাঙ্গা এলাকায় প্লান্ট (কারখানা) তৈরি করে পরিবেশ অধিদপ্তর। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের সোয়া ৫ কোটি টাকা দিয়ে তৈরি এ কারখানার কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের ১৫ জুন। এরপর তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে। তেল উৎপাদন দূরের কথা, কারখানার চাকাই ঘোরেনি।
প্লান্টটি বুঝে নিতে খুলনা সিটি করপোরেশনকে (কেসিসি) চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। কেসিসির প্রকৌশলীরা পরিদর্শন করে দেখতে পান, তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের কারিগরি বিবরণী (স্পেসিকেশন) নেই। যন্ত্রগুলোর মান যাচাইয়ের সুযোগ নেই। অন্যান্য যন্ত্র এবং কাজের মানও সন্তোষজনক নয়। এ প্লান্ট ৬ মাস চালিয়ে এরপর বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয় কেসিসি। কিন্তু চালিয়ে দেখাতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান। অচল যন্ত্র বুঝে নিয়ে বিপাকে পড়ার ভয়ে প্লান্ট বুঝে নেয়নি সিটি করপোরেশন।
সম্প্রতি অচল অবস্থাতে প্লান্টটি গছিয়ে দিতে চেষ্টা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও প্লান্ট যে অবস্থায় রয়েছে, সেভাবেই বুঝে নিতে বলা হয়েছে। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শুধু কম্পোস্ট প্লান্ট তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু কেসিসির নতুন প্রশাসক বলছেন, সচল করে চালিয়ে দেখাতে হবে; এরপর প্লান্ট বুঝে নেবে কেসিসি। ফলে আবারও ঝুলে যাচ্ছে প্লান্টের ভাগ্য।
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গ্রিন হাউস গ্যাস কমাতে বর্জ্য হ্রাস, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য পুনঃচক্রায়নের লক্ষ্য নিয়ে ‘থ্রি-আর পাইলট উদ্যোগ বাস্তবায়ন (ফেজ-১)’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গা মৌজার দুই একর জমিতে প্লান্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ৩ জুলাই। এই প্লান্টে বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ২০ টন কম্পোস্ট এবং প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ৫০০ লিটার তেল উৎপাদন হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পের আওতায় প্রশাসনিক ভবন, সীমানা প্রাচীর, কম্পোস্ট প্লান্ট, জ্বালানি উৎপাদন প্লান্ট নির্মাণ, এক্সক্যাভেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এসবের পেছনে ব্যয় হয় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে সব টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্লান্টটি কেসিসিকে বুঝে নিতে চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। একাধিক কমিটিও গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ মে কেসিসির তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ৫ জন প্রকৌশলী প্লান্টটি ঘুরে দেখেন।
পরে ২৬ জুন আবদুল আজিজ প্রকল্প পরিচালককে চিঠি দিয়ে জানান, তিনটি শর্তে কেসিসি প্লান্টটি বুঝে নিবে। এর মধ্যে নির্মাণের সকল কাজ শিডিউল মোতাবেক সম্পন্ন হয়েছে– মর্মে বুঝিয়ে দিতে হবে; জৈব সার ও জ্বালানি তেল তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কেসিসির প্রতিনিধিদের দেখিয়ে দিতে হবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর মনোনীত প্রতিষ্ঠান সেবক এগ্রোভেস্টকে কমপক্ষে ৬ মাস সফলজনকভাবে প্লান্টটি পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু এই চিঠির বিপরীতে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। গত ২৫ জুন সরেজমিন প্লান্ট ঘুরে দেখা গেছে, ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে পুরো এলাকা। এক্সক্যাভেটরসহ যন্ত্রে মরিচা পড়েছে। বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি হয়ে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার প্লান্ট ঘুরে দেখেন পরিবেশ অধিদপ্তর-খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিন বছর পড়ে থাকলে যা হয়, সেটিই হয়েছে। অনেক জিনিস চুরি হয়েছে। এখন আমরা কম্পোস্ট প্লান্ট আগে শুরু করতে চাইছি। প্লাস্টিক থেকে তেল তৈরিতে আরেকটু সময় লাগবে। বিষয়টি আমরা ঢাকা অফিসকে জানাব, ওই মেশিনটির বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত জানাবেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মাসুদ ইকবাল মো. শামীম জানান, কেসিসির তৎকালীন মেয়রের অনুরোধেই পাইলট প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এর পাশেই কেসিসির বড় আরেকটি প্লান্ট হওয়ার কথা ছিল। আমরা প্লান্ট তাদের চালিয়ে দেখিয়েছি। এই প্রকল্পের অন্য জেলার প্লান্টগুলো ভালোভাবে চলছে। এটিও দ্রুত শুরু হবে বলে আশা করি।
কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, প্লান্ট চালু করে বুঝিয়ে দিলে আমাদের গ্রহণ করতে সুবিধা হতো। বন্ধ একটি কারখানা, যার যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না; সেটি বুঝে নিয়ে পরে সমস্যা হলে কে দায় নেবে? এ জন্য সময় নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা এ নিয়ে কাজ করছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, অচল প্লান্ট আমরা বুঝে নেব না। চালু করে এরপরই আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।
