‘শব্দ শুনে সামনে যেতেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে’
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহ নগরীর গোলপুকুরপাড় এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। একটি পুরাতন লোহার দোকানে রাখা ২৫ বছরের অধিক সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ বিষাক্ত গ্যাস সিলিন্ডার ট্রাকে তোলার সময় পড়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই ঘটনায় অন্তত ৩৯ জন অসুস্থ হয়ে পড়লে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষগুলোকে প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে।
গত সোমবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় ভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি। তবে এই ঘটনা উন্মোচন করেছে জনবহুল এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ভাঙাড়ি দোকানগুলোর ভয়াবহ ঝুঁকি ও প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নজরদারির অভাব।
গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মেসার্স সাদিয়া আয়রন স্টোর নামে একটি ভাঙাড়ি দোকান থেকে পুরাতন মালপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দোকানের সামনে রাখা একটি ট্রাকে লোহালক্কড় তোলার সময় ২৫ বছরের পুরোনো তিনটি সিলিন্ডারের একটি নিচে পড়ে যায়। প্রচণ্ড শব্দে একটি সিলিন্ডারের মুখ ফেটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে বিষাক্ত গ্যাস।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহিন মিয়ার মতে, গ্যাসটি অন্তত ২০-২৫ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হয়ে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। এই গ্যাসের সংস্পর্শে কেউ দীর্ঘক্ষণ থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। ভাগ্য ভালো সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিমাণ কম ছিল, নতুবা ব্যাপক বিস্ফোরণে আশপাশে আগুন ধরে গিয়ে বড় ধরনের প্রাণহানি হতে পারত।
বিস্ফোরণের পরপরই বিষাক্ত গ্যাস প্রায় ৫০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গোলপুকুরপাড় এলাকায় লোহালক্কড়ের অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি দোকান রয়েছে, যার মধ্যে সাত-আটটি দোকানে নিয়মিতভাবে গ্যাস ব্যবহার করে ভারী ধাতু কাটা হয়। দুর্ঘটনার পর এলাকাটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়।
দোকানের ঠিক ১০ গজ দূরেই মৈত্রী টাওয়ার নামে একটি ১৮ তলা আবাসিক ভবন। সেখানে শতাধিক পরিবার বসবাস করে। বিকট শব্দ ও গ্যাসের তীব্র গন্ধে দিশেহারা হয়ে ভবনটির বাসিন্দারা জীবন বাঁচাতে দ্রুত নিচে নেমে আসেন। মৈত্রী টাওয়ারের পাশাপাশি আশপাশের আবাসিক এলাকার মানুষজনও আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত অসুস্থ ৩৯ জনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেডিসিন ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, বিষাক্ত গ্যাসের কারণে রোগীদের শ্বাসতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল। তবে চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
ঘটনাস্থলের পাশের বিসমিল্লাহ আয়রন স্টোরের মালিক মাসুম মিয়া নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘শব্দ শুনে সামনে যেতেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কোনোভাবেই বাতাস নিতে পারছিলাম না। দৌড়ে ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে রিকশা নিয়ে হাসপাতালে যাই।’
দুর্ঘটনার পর পরই গত সোমবার রাত ৯টার দিকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি গ্যাসের গন্ধ নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, যে দোকানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেছে, তাদের কোনো লাইসেন্স ছিল কি না খতিয়ে দেখা হবে। পলাতক মালিককে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সহীন ব্যবসা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই এলাকার ভাঙাড়ি দোকানগুলোর বিস্ফোরক অধিদপ্তর বা ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদন নেই। সিটি করপোরেশন থেকে সাধারণ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েই তারা এই বিপজ্জনক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ২৫-৩০ বছর ধরে এই ব্যবসা চলছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো নজরদারি ছিল না। দুর্ঘটনা ঘটলেই সবাই তৎপর হয়ে ওঠে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক জানে আলম জানান, বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে পরিত্যক্ত সিলিন্ডারগুলো ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফায়ার সার্ভিস থেকে তদন্ত রিপোর্ট অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বিস্ফোরণ
