ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল

একের পর এক গার্মেন্ট শ্রমিক অসুস্থ, তদন্তে স্বাস্থ্য বিভাগ

একের পর এক গার্মেন্ট শ্রমিক অসুস্থ, তদন্তে স্বাস্থ্য বিভাগ
×

 নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার  

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাভারের আশুলিয়ায় ৬টি তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে এসব গার্মেন্টের অর্ধশতাধিক শ্রমিক শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথার সমস্যায় আক্রান্ত হলে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে কী কারণে শ্রমিকরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তা প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। এ ঘটনায় শ্রমিকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। 
অন্যদিকে কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। 

অসুস্থ শ্রমিক, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ জানায়, গতকাল সকালে আশুলিয়ার লুসাকা গার্মেন্টস, অরুনিমা স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড, অ্যালায়েন্স নিট লিমিটেড, মিলেনিয়াম টেক্সটাইল লিমিটেড, ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড ও জিনতাই টু অ্যাপারেল গার্মেন্টসের শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন। তাদের অনেকেই মাথাঘোরা, বমি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আক্রান্ত হতে থাকেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে লুসাকা গার্মেন্টসের সব ইউনিটে গতকাল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানার শ্রমিক ও কর্মকর্তারা জানায়, প্রতিদিনের মতো সকালে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ ২৫-৩০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কারখানাটির শ্রমিক কল্পনা আক্তার বলেন, সকালে কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার পর মেশিনের ভেতর থেকে একটা গন্ধ আসে। এরপর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে এবং হাত-পা অবশ হয়ে আসে। এ সময় বমি বমি ভাব হলে মাথা ঘুরে পড়ে যাই। 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অপারেটর সেলিনা আক্তার বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ মাথা ঘুরতে শুরু করে। এরপর বমি বমি ভাব হয় এবং একপর্যায়ে বমি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে দেখি হাসপাতালে আছি। আরেক শ্রমিক রূপালি বেগম জানান, প্রথমে তাঁর মাথা ঘোরা ও পরে বমি বমি ভাব শুরু হয়। অসুস্থ বোধ করায় তিনি কারখানার মেডিকেল সেন্টারে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, তাঁর মতো আরও অনেক শ্রমিক চিকিৎসা নিচ্ছেন।

কারখানার ফায়ার সেফটি অফিসার নাহিদ বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১১টার দিকে ফ্লোর থেকে একের পর এক কর্মী আমাদের মেডিকেল সেন্টারে আসতে শুরু করেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। যাদের সমস্যা বেশি ছিল, তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখন মোটামুটি সবাই সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। 

নাহিদ হাসান আরও বলেন, গত সোমবারও দুপুরের খাবারের পর ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে শ্রমিকদের মাথা ঘুরতে শুরু করে। পরে বমি বমি ভাব, বমি এবং কয়েকজনের ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। 
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, কোরবানির ঈদের আগ থেকেই আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অতিরিক্ত গরম, কারখানার ভেতরে অক্সিজেনের স্বল্পতা, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভাব এবং রক্তশূন্যতার মতো কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাভার ল্যাবজোন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আবদুল আহাদ বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লুসাকা গার্মেন্টস থেকে একসঙ্গে অনেক রোগী আমাদের এখানে এসেছেন। তাদের প্রধান সমস্যা ছিল শ্বাসকষ্ট। এর সঙ্গে কয়েকজনের বমি এবং কারও কারও মাথা ঘোরার উপসর্গ ছিল। আমরা প্রাথমিকভাবে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা দিয়েছি। যাদের অবস্থা তুলনামূলক বেশি খারাপ ছিল, তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। যারা ভালো আছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সাইদুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার অন্তত ছয়টি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। এসব কারখানাতেও বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের একই ধরনের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয়। 

তিনি আরও বলেন, আমিসহ সাত সদস্যের একটি টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন– মেডিকেল ডিজিস কন্ট্রোল অফিসার (এমওডিসি) ডা. আরমান আহমেদ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শান্তনু কুমার সাহা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আশরাফুল আলম ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. আবু সামা সরকার ও নার্সিং সুপারভাইজার মার্গারেট ধনী। 

শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গত তিন চারদিনে আশুলিয়ায় অন্তত ৬টি কারখানার শ্রমিকরা একই ধরনের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হওয়ার পর সে সব রোগী ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি। অসুখের সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ বলতে পারেননি। তবে কারখানার শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি এটি ম্যাস হিস্টিরিয়া বা ম্যাস সাইকোজেনিক ডিজিজ। অসুস্থ সবাই আশঙ্কামুক্ত আছেন। তাদের মধ্যে অনেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
 

আরও পড়ুন

×