ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

আমবাজারে ‘ঢলতা’র দাপট

আমবাজারে ‘ঢলতা’র দাপট
×

ভ্যানে আম নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। গত বৃহস্পতিবার নওগাঁর সাহাপাহার জিরো পয়েন্ট আমের বাজারে সমকাল

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের মোকাম নওগাঁর সাপাহার আমের হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার, বেপারি ও ব্যবসায়ী সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। বাজারজুড়ে চলছে আম্রপালি, ল্যাংড়া, ব্যানানা ম্যাংগো, বারি-৪, হাঁড়িভাঙাসহ বিভিন্ন জাতের আম কেনাবেচা। তবে এই জমজমাট বাণিজ্যের আড়ালে চাষির দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ঢলতা’। এটি ৫০ থেকে ৫২ কেজিকে এক মণ ধরে আম কেনার পুরোনো প্রথা। প্রশাসনের কেজিভিত্তিক বিক্রির নির্দেশনা কার্যকর না হওয়ায় ক্ষুব্ধ চাষিরা।

সম্প্রতি দেখা যায়, তাজপুর পেট্রোল পাম্প এলাকা থেকে সাপাহার-নজিপুর আঞ্চলিক সড়কের গোডাউনপাড়া মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দুই পাশে বসেছে আমের হাট। ভোর হওয়ার আগেই ভ্যান, ভটভটি ও অটোরিকশায় ক্যারেটভর্তি আম নিয়ে বাজারে আসেন চাষিরা। সকাল গড়াতেই শুরু হয় দরদাম। চলে দিনভর কেনাবেচা।

কিন্তু বাজারের এই প্রাণচাঞ্চল্যের মাঝেও কৃষকদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী কেজিতে আম বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ পাইকার ও ব্যবসায়ী ৫০-৫২ কেজিকে এক মণ ধরে আম কিনছেন। এতে প্রতি মণে ১০ থেকে ১২ কেজি বিনামূল্যে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের দাবি, সরকার যখন কেজিভিত্তিক আম বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টন। গত বছর ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল।

রোববার বাজারে মানভেদে প্রতি মণ আম্রপালি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা; ল্যাংড়া ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা; ব্যানানা ম্যাংগো ২ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকা; হাঁড়িভাঙা ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা এবং বারি-৪ জাতের আম ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।
কুচিন্দা এলাকার চাষি আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার ১০ বিঘা জমিতে আম্রপালি বাগান। আজ ৩৫ ক্যারেট আম নিয়ে এসেছি। গত বছর একই মানের আম ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকার বেশি কেউ বলছে না। এর ওপর ৫২ কেজিতে মণ ধরছে।’
পোরশা উপজেলার সরাইগাছী গ্রামের চাষি কামরুজ্জামান বলেন, ‘সরকার কেজিতে বিক্রির সিদ্ধান্ত দিয়েছে; শুনেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে দেখি আগের নিয়মই চলছে। দামও কম, আবার প্রতি মণে অতিরিক্ত আম দিতে হচ্ছে। শুধু নির্দেশ দিলেই হবে না; মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের সব বড় মোকামে একই নিয়ম অনুসৃত হওয়ায় তারা এককভাবে তা পরিবর্তন করতে পারছেন না।
চট্টগ্রামের কদমতলী থেকে আসা ব্যবসায়ী আজাহার আলী বলেন, ‘এবার দেশের বড় বাজারগুলোতে চাহিদা কম। কম দামে কিনেও অনেক সময় লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
ভাই ভাই ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী রুহুল আমিন বলেন, ‘সব ক্যারেটের আম এক মানের হয় না। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করেই কোথাও ৪৮, কোথাও ৫০, আবার কোথাও ৫২ কেজি ধরা হয়। সব জায়গায় ৫২ কেজি নেওয়া হয়– এমনটি ঠিক নয়।’
সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, ‘ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে অনেক আমের গায়ে কালো দাগ পড়েছে। শুধু সাপাহারে কেজি চালু করলে এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। সারাদেশে একই নিয়ম কার্যকর করতে হবে।’
ইউএনও রোমানা রিয়াজ বলেন, ‘বাজারে নিয়মিত মনিটরিং চলছে। ওজন নিয়ে অভিযোগ পাইনি, পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×