ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোয়াইনঘাট

তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোয়াইনঘাট
×

গোয়াইনঘাটের ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদের জানাজায় গতকাল সোমবার স্থানীয়দের উপস্থিতি সমকাল

 গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠে পরিচয়। এরপর সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। পড়ালেখা, ঘোরাঘুরি, খেলাধুলা কিংবা আড্ডা–সবকিছুতেই তারা ছিল একে অন্যের ছায়াসঙ্গী। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তারা ছিল একসঙ্গে। একই দিনে ত্যাগ করেছে পৃথিবীর মায়া।

এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় সর্বহারার আর্তনাদে ভারি তিনটি পরিবার, শোকস্তব্ধ গোটা গোয়াইনঘাট উপজেলা। রোববার এক মর্মান্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে উপজেলার জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী– সাকিব আহমদ, রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদ।
গত রোববার রাত ও গতকাল সোমবার সকালে নিহত তিনজনের পৃথক জানাজা ও মরদেহ দাফন সম্পন্ন করেন তাদের পরিবার ও এলাকাবাসী। জানা যায়, দুর্ঘটনার দিন একজনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ না হতেই তাদের আরেকজনের মৃত্যুর বার্তা আসতে থাকে। একে একে তিন তিনটি সন্তানের লাশের ভারে হাঁপিয়ে ওঠে স্থানীয় বাসিন্দারা।
রোববার রাতে বাদ এশা জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নিহত সাকিব আহমদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার বেলা ১১টায় ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে রায়হান আহমেদের এবং বাদ জোহর লাখেরপাড় গ্রামের হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জয় আহমদের জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে তিনজনের মরদেহ নিজ নিজ এলাকার সামাজিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত রোববার পরীক্ষা শেষে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেলে করে গোয়াইনঘাট-জাফলং সড়কের জাফলং চা বাগান এলাকায় যায় তিনি বন্ধু সাকিব, রায়হান ও জয়। সেখান থেকে রাধানগর বাজার যাওয়ার পথে অতিরিক্ত গতিতে চলতে থাকা তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। এতে গুরুতর আহত হয় ওই তিনজন। পরে জান যায়, তাদের মধ্যে সাকিব ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। আহত দুজন সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
সোমবার নিহত তিন শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের কেউ আর্তনাদ করছেন, কেউ বা তাদের ব্যাগ ও পোশাক জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সন্তানহারা মায়েরা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা না থাকায় আঙিনায় দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন পাড়া-প্রতিবেশী।

নিহত সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, ‘তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী। সে বোঝা যে বয়েছে শুধু সেই জানে।’
রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ‘সকালে বাড়ি থেকে বের হলো পরীক্ষা দিতে, আর ফিরল লাশ হয়ে–এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’ কন্নাজড়ানো কণ্ঠে জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া জানান, তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। তাদের মধ্যে সখ্য ছিল দারুণ। আল্লাহ তাদের মৃত্যুতেও পৃথক করেননি।
এদিকে তিন বন্ধুকে হারানোর আকস্মিকতায় বাকরুদ্ধ সহপাঠীরা। জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ শোকের ভারে স্তব্ধ। সহপাঠী ও শিক্ষকরা কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন বার বার। তারা জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই চোখের সামনে পরীক্ষা দিল। কিছু সময় ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়েছে। একটু পরেই তাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছিল না।
এ নির্মম দুর্ঘটনায় তিন শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পর পরই স্থানীয় বাসিন্দা ও নেটিজেনরা সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে বাবা-মায়ের এমন মৃত্যুযন্ত্র তুলে দেওয়াকে তারা অভিভাবকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবে আখ্যা দেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বলেন, এভাবে সম্ভাবনাময় তিনটি তাজাপ্রাণ ঝরে গেল। পরিবার ও সমাজের বেখায়ালিপনায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের লাইসেন্স ছাড়া অবাধে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়। তাদের অধিকাংশই বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়। এর ফলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আরও পড়ুন

×