গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে হয়রানিসহ বেহিসাবি অভিযোগ
ছবি: সমকাল
আজু শিকদার, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৩
আর্থিক অনিয়ম, নারী সহকর্মীদের হয়রানিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের নেতৃত্বে আছেন হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০–৮০০ রোগী সেবা নিতে আসে। এ জন্য তাদের তিন টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু অলিখিতভাবে এই টিকিটের মূল্য হয়ে গেছে পাঁচ টাকা। কোনো রোগী ১০ টাকা দিলেও ভাঙতি না থাকার অভিযোগে অধিকাংশ সময় তাঁকে বাড়তি টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। কোনো রোগী টাকা ফেরত চেয়ে জোরাজুরি করলে পাঁচ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। অনিয়মের মাধ্যমে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া এই টাকার পরিমাণ দিন শেষে দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই হাজার।
১৩ জুলাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীদের টিকিট দিচ্ছেন কাউন্টার ইনচার্জ মো. আলতাফ হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করছেন শিলা রানী। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে আলতাফ হোসেন সটকে পড়েন। আউটসোর্সিং কর্মচারী শিলা রানী জানান, গত দুই মাস তিনি বহির্বিভাগের কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। ভাঙতি না থাকার কারণে যে অতিরিক্ত টাকা আসে হয়, তা তিনি হাসপাতালের অফিস সহকারী শিব শংকরের কাছে জমা দেন। টিকিট বিক্রি করে যে টাকা পান তাও তাঁর কাছেই জমা দেন।
অফিস সহকারী শিব শংকর অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুধু টিকিটপ্রতি তিন টাকা হিসাবে যা আসে তাই জমা নেই।’
কথা হয় স্বাস্থ্য বিভাগের খাদ্য পরিদর্শক মাধবী সরকারের সঙ্গে। তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আজ এখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাচ্ছি। হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে গঠিত সিন্ডিকেট আমার কর্মকালে জীবনটা অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে আমার দায়িত্ব এই উপজেলার খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু হাসপাতালে রোগী পরিবহনের ট্রলিতে করে রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হয়। যা চরমভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এ ছাড়া আবুল কালাম আমার কাছে খাঁটি ঘি, মোবাইল ফোন ইত্যাদি দাবি করতেন। আমি দাবি পূরণ না করায় তিনি আমাকে প্রতিনিয়ত হয়রানি করতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ হলে মেডিকেল ছুটির প্রয়োজন হয়। এই ছুটি পাস করানোর জন্য আবুল কালাম আমার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, অন্যায়ভাবে আমার সাত মাসের বেতন আটকে রেখেছিলেন তিনি। আমি জিপি ফান্ড থেকে লোনের আবেদন করলে আবুল কালাম আমার কাছে ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।’
মাধবী সরকার বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এখানে যোগদান করার পর প্রথম দিকে ভালোই থাকেন। কিন্তু কী যে হয়, কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।
জানা যায়, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ আগের কর্মস্থলে থাকার সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় ২০২৪ সালে তাঁকে তিরস্কার দণ্ড (লঘু) ও চাকরি বইয়ে লাল কালি দ্বারা লিপিবদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়।
আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে নারী কর্মচারীদের হয়রানি করার অভিযোগও আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক নারী কর্মচারী বলেন, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ তাঁকে একদিন নোংরা প্রস্তাব দেন। তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করেন। বিষয়টি হাসপাতালের অন্য স্টাফরাও দেখেছিলেন।
তবে হিসাবরক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকিট থেকে আসা তিন মাসের অতিরিক্ত ১৫-১৮ হাজার টাকা হাসপাতাল ফান্ডে জমা করা হয়েছে।
মাধবী সরকারের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, মাধবী সরকার খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তাই খাঁটি ঘি কিনে দিতে বলেছিলাম। এর জন্য তাঁকে আমি টাকা দিয়ে দিতাম। আর তিনি ঢাকায় যাতায়াত করেন বলে তাঁকে একটি ফোন সেট কিনে আনতে বলেছিলাম। যার টাকা আমি অবশ্যই পরিশোধ করতাম।’
আগের কর্মস্থলে দুদকের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘আগের কর্মস্থলে আমার বিরুদ্ধে দুদকে যে অভিযোগ ছিল, তা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গোয়ালন্দ উপজলো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বলেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- রাজবাড়ী