চার বছরে আয় এক কোটি টাকা, ব্যয় ৬ কোটি
অযত্নে ভেঙে পড়ে আছে শিশুদের খেলার রাইড। সম্প্রতি সালনা রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পট থেকে তোলা সমকাল
ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর কোলাহল পেরিয়ে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে গেলে শালবনের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে একটি সরকারি রিসোর্ট। চারপাশে গাছপালা, ছয়টি কটেজ, পিকনিক শেড, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল, কাগজে-কলমে সব আছে। থাকার কথা ছিল পর্যটকের ভিড়, জমজমাট থাকার কথা ছিল বিভিন্ন আয়োজন। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা ভিন্ন। পর্যটক টানতে না পেরে প্রতিবছর কয়েকগুণ বেশি ব্যয়ের বোঝা বহন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা সালনা রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পট চার বছরে আয় করেছে এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অথচ এই সময়ে এর পেছনে ব্যয় হয়েছে ছয় কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এই পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি সরকারের আয় করার কথা, সেখানে উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে লোকসানের বোঝা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত টাকা খরচ করে তৈরি করার পরও কেন পর্যটক টানতে পারছে না সালনা রিসোর্ট?
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছিল রিসোর্টের নির্মাণকাজ। সালনা পার হয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে বন বিভাগের প্রায় ৯ বিঘার বেশি জমির ওপর শালবনের প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকেন্দ্রটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। সাড়ে তিন বছর পর ২০২২ সালের জুনে শেষ হয় নির্মাণকাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ধারণা ছিল রাজধানীর কাছে প্রকৃতির মধ্যে পরিবার নিয়ে অবসর সময় কাটানোর সুযোগ নেবেন বিনোদনপ্রত্যাশীরা। কিন্তু স্থাপনা তৈরি হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন সূত্র বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রিসোর্টের পরিচালনায় ব্যয় হয় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয় মাত্র ২৩ লাখ টাকা। ফলে ওই বছর লোকসান হয় এক কোটি ১৯ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে ব্যয় হয় এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আয় হয় ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঘাটতি এক কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৭০ লাখ টাকায়। সে বছর আয় হয় ৬৭ লাখ টাকা। ফলে লোকসান হয় এক কোটি তিন লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিসোর্টের পেছনে ব্যয় হয় সবচেয়ে বেশি এক কোটি ৯১ লাখ টাকা। অথচ আয় কমে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ টাকায়। এক অর্থবছরে সরকারের লোকসান এক কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
সবমিলিয়ে চার বছরে রিসোর্ট পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ছয় কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আয় হয়েছে এক কোটি ৮৮ লাখ। অর্থাৎ চার বছরে সরকারি অর্থের প্রায় চার কোটি ৮০ লাখ টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সালনার সবচেয়ে বড় সুবিধা তার অবস্থান। রাজধানী থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শালবনের মনোরম পরিবেশও রয়েছে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা করপোরেট আয়োজন– বিভিন্ন ধরনের পর্যটকের জন্য জায়গাটি ব্যবহার করার সুযোগ আছে। রিসোর্টে রয়েছে কটেজ, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল, পিকনিক শেডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। এরপরও পর্যটকের আনাগোনা আশানুরূপ না হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে রিসোর্টে ঘুরতে আসেন ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় সালনার সম্ভাবনা অনেক। তবে মানুষকে বারবার এখানে আসার কারণ তৈরি করতে হবে। শুধু জায়গা সুন্দর হলে হবে না, বিনোদন, সেবার মান ও নতুনত্ব থাকতে হবে।
লাইলী বেগম নামে এক স্কুল শিক্ষিকা বলেন, পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করেন, তার অনেক কিছু আরও উন্নত করা দরকার। সরকারি অর্থে বড় প্রকল্প হয়েছে, এখন সেটিকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা সবচেয়ে জরুরি। আবুল কালাম নামে একজন দর্শনার্থী বলেন, সরকারি এই রিসোর্টের প্রচার নেই। অনেকে এটির কথা জানেন না। তাছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্যও কিছু নেই। মোজাম্মেল হক নামে একজন পর্যটক বলেন, পর্যটকের চাহিদা অনুযায়ী বিনোদনের ব্যবস্থা, মানসম্মত খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সেবার মান, প্রচার– সবকিছুর সমন্বয় দরকার। রাজধানীর এত কাছে থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষ সেখানে যাওয়ার জন্য আগ্রহী না হন, তাহলে শুধু নতুন স্থাপনা তৈরি করে সেই সংকট কাটবে না।
স্থানীয়রা বলছেন, গাজীপুর জেলায় প্রায় ৩০০ বেসরকারি রিসোর্ট রয়েছে। সাধারণত এসব রিসোর্টে রয়েছে নারী-পুরুষ ও শিশুদের জন্য উন্মুক্ত এবং চমৎকার ডিজাইনের আউটডোর সুইমিংপুল ও রিলাক্সেশনের জন্য জাকুজি। রয়েছে কৃত্রিম লেক, শানবাঁধানো ঘাট এবং লেকে ঘোরার জন্য প্যাডেল বোট ও ক্যানোয়িংয়ের ব্যবস্থা। বেশির ভাগ রিসোর্টে রয়েছে বিশাল আকারের ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মাঠ, লন টেনিস, ব্যাডমিন্টন ও ভলিবল কোর্ট, বিলিয়ার্ড, টেবিল টেনিস ও ইনডোর কিডস জোন। এ ছাড়া মিনি পার্ক, সাইকেল ও ট্রাই-সাইকেল চালানোর সুবিধা, ওয়াকিং ট্রেইল এবং নিজস্ব মুভি থিয়েটারও থাকে অনেক রিসোর্টে। এসবের কিছু নেই সরকারি সালনা রিসোর্টে।
রিসোর্টকে আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক সাবির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, পর্যটক টানতে রিসোর্টকে আরও আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও নতুন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। যেমন এখানে খেলার মাঠ, কিডস জোন ও সুইমিংপুল নেই। এ সব গড়ে তোলা হলে পর্যটকরা পরিবার নিয়ে এখানে আসবেন। তিনি আরও বলেন, এখন আমরা লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছি। গত মাসেও ২০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
- বিষয় :
- পার্ক