পুলিশের জব্দ করা মদের হিসাব নিয়ে নয়ছয়
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২১ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘সন্ধ্যায় আমার দোকানের সামনে একটি কাভার্ডভ্যান এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর সাদা পোশাকের দুজন পুলিশ পরিচয় দিয়ে গাড়িটি জব্দ করেন। এক-দুই ঘণ্টা পর পোশাক পরা থানার পুলিশ আসে। তারা গাড়িতে অবৈধ মালপত্র আছে জানিয়ে আমাকে সাক্ষী হতে বলেন। আমাকে এসবে না জড়াতে অনুরোধ করি। পরে দোকান বন্ধ করে রাত ১২টার দিকে বাসায় চলে যাই। পরদিন সকালে এসে একটি কাগজে জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কাভার্ডভ্যানে কী ছিল, আমাকে দেখানো হয়নি।’
সমকালকে এসব কথা বলেন চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়ায় গত ২৭ মে কাভার্ডভ্যানভর্তি বিদেশি মদ জব্দ করা নিয়ে মামলার সাক্ষী দোকানদার জামাল হোসেন। আরেক দোকানদার জহির হোসেনও মদের চালান ধরা পড়ার পরদিন সকালে তাঁর দোকানে পুলিশ এসে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর নেওয়ার কথা জানান। তাঁর সামনেও কোনো মালপত্র গোনা হয়নি, গাড়িতে কী ছিল, তা তিনি দেখেননি।
অভিযোগ উঠেছে, বাগেরহাট থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে আসা ওই চালানে ৩১৪ কার্টন বিদেশি মদ ছিল। প্রতিটি কার্টনে ১২টি বোতল ছিল। পুলিশ জব্দ করার পর সেখান থেকে ১১০ কার্টন, অর্থাৎ এক হাজার ৩২০ বোতল মদ গায়েব হয়েছে। জব্দ তালিকা ও মামলার এজাহারে ২০৪ কার্টন মদের বোতল সাক্ষীদের সামনে জব্দ করার তথ্য রয়েছে। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (এলআইসি) মোহাম্মদ শরীফুল আলম চৌধুরী সুজন। বিশাল এই চালান জব্দ হলেও তখন এর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযানে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন দুজন পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাকলিয়ায় কাভার্ডভ্যানটি সাদা পোশাকে জব্দ করেন এসি শরীফুল আলম চৌধুরী সুজন। মদভর্তি কাভার্ডভ্যান বাকলিয়া থানার পরিবর্তে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে নিজের কার্যালয়ে নিয়ে যান তিনি। সেখানে রাত ৪টা পর্যন্ত চালকসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন কাভার্ডভ্যানটি পুলিশ লাইন্সের ভেতর রেশন গোডাউনের পাশে ছিল। সেখান থেকেই ১১০ কার্টন মদ সরানো হয়। পুলিশ লাইন্সের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই সত্যতা মিলবে। বাকলিয়ায় আটক করা কাভার্ডভ্যান দামপাড়ায় পুলিশ লাইন্সে নেওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই। সরানো মদ একজন কনস্টেবলের মাধ্যমে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’
মদের চালান বাগেরহাট থেকে মো. কামরুজ্জামান ও মো. লোকমান নামে দুই ব্যক্তি চট্টগ্রামে পাঠান। চালানটি চট্টগ্রামে বিক্রি করার কথা ছিল আশীষ কান্তি নাথ নামে বাকলিয়ার এক ব্যক্তির। তিনি মামলার ২ নম্বর আসামি। আশীষ বলেন, ‘আমি নানা ধরনের মালপত্র বিক্রির কাজ করি। বাগেরহাট থেকে আমার পরিচিত এক ব্যক্তি কিছু বিদেশি বৈধ মদ বিক্রির কথা বলেন। অরুণ বাবু ও জালাল নামে দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রির জন্য আলোচনা চূড়ান্ত করেছিলাম। অরুণ ও জালাল মদ কিনতে বাকলিয়ায় আসেন। আধঘণ্টা পর এসি শরীফুল আলম সাদা পোশাকে বাকলিয়ায় হাজির হন। তিনি গাড়িভর্তি সামগ্রী এবং অরুণ, জালাল, আমিসহ সাতজনকে আটক করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যান। দামপাড়া থেকে রাত ৪টায় চালকসহ পাঁচজনকে বাকলিয়া থানায় পাঠান। দেনদরবার করে দামপাড়া থেকে চালানের ক্রেতা অরুণ ও জালালকে ছেড়ে দেন এসি শরীফুল আলম। পরে গাড়িটি দামপাড়া থেকে থানায় পাঠানো হয়।’
কাভার্ডভ্যানের চালক মো. জসিম বলেন, ‘বাগেরহাট থেকে ৩১৪ কার্টন আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এসব বাকলিয়ায় ক্রেতাদের বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই পুলিশ আমাদের আটক করে। দামপাড়ায় আট ঘণ্টা আটকে রেখে পরে বাকলিয়া থানায় পাঠায়। এখন শুনছি, এজাহারে ২০৪ কার্টন উল্লেখ করেছে। তাহলে ১১০ কার্টন গায়েব করে দিয়েছে পুলিশ।’
এ ঘটনায় চালকসহ সাতজনকে আসামি করে বাকলিয়া থানায় মামলা করে পুলিশ। মামলার বাদী ও জব্দ তালিকা তৈরি করা এসআই শরীফ উল্লাহ বলেন, ‘বাকলিয়ায় কল্পলোক আসাসিকের ২ নম্বর রোডের শেষ মাথায় জামাল স্টোরের সামনে কাভার্ডভ্যানের ভেতর ঢুকে কত কার্টন ও কত বোতল মদ ছিল, তা গণনা করেছি। ওই সময় সাক্ষী দোকানদার জামাল ও জহির সামনে ছিলেন। রাতেই তাদের কাছ থেকে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নিয়েছি। তারা কেন ভিন্ন বক্তব্য দিল বুঝতে পারছি না।’ অন্যদিকে, জব্দ তালিকার ৩ নম্বর সাক্ষী অভিযানে থাকা পুলিশ কনস্টেবল কাউসার হোসেন বলেন, ‘থানায় নেওয়ার পর সেখানে কাভার্ডভ্যানে থাকা মদের কার্টন গণনা করা হয়। বোতল গণনা করা হয়নি। বাকলিয়ায় জামাল স্টোরের সামনে মদের কার্টন গণনা করা হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চট্টগ্রাম মহানগরের পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীকে একাধিকবার ফোন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম মহানগরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, এখনও অভিযোগ আসেনি। কোনো গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এসি শরীফুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলে এবং এ বিষয়ে বক্তব্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাসিমুল ইসলাম বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না।