ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নামেমাত্র নাগরিক সেবা, বছর ঘুরলেই কর হয় বহুগুণ

নামেমাত্র নাগরিক সেবা, বছর  ঘুরলেই কর হয় বহুগুণ
×
×

অল্প বৃষ্টিতেই বাড়ির আঙিনায় জমে যায় পানি। গত রোববার হরিণাকুণ্ডুর কারিগরপাড়ায় সমকাল

এম. সাইফুজ্জামান তাজু, হরিণাকুণ্ডু (ঝিনাইদহ)

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। সড়কবাতি কী জিনিস, তা বোঝেন না পৌরবাসী। বর্জ্য অপসারণ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। নালা ব্যবস্থাপনাও অপ্রতুল। কাঁচা-পাকা সড়কগুলোর অবস্থা বেহাল। অথচ বছর ঘুরলেই বাসিন্দাদের ওপর করের বোঝা চাপে কয়েক গুণ। এ চিত্র ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার। 
২০০২ সালের ২৫ অক্টোবর ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে হরিণাকুণ্ডু প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এটি ‘খ’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। বর্তমানে ১২.৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ডের মোট জনসংখ্যা ৩০,৩৭৬। বর্তমানে ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে পৌরসভা।
পৌর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এলাকায় মোট ৭০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩০ কিলোমিটার পাকা এবং ৪০ কিলোমিটার কাঁচা। ড্রেনেজ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মাত্র ৩ কিলোমিটার পাকা ও ১০ কিলোমিটার কাঁচা। 

জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী 
৬ নম্বর ওয়ার্ডের কারিগরপাড়ার বাসিন্দা জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘নামেই এটি পৌরসভা, কিন্তু রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন নেই। খাওয়ার পানির ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত করা হয়নি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। হরিণাকুণ্ডুর সিংহভাগ নাগরিক কোনো সেবাই পান না।’ তিনি জানান, পৌরসভার নিষ্ক্রিয়তায় বাধ্য হয়ে এবার তারা নিজেরাই সড়ক কেটে পাইপ বসিয়ে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের চিন্তা করছেন।
অন্যদিকে ইজিবাইক চালক জমির উদ্দিনের ভাষ্য, শহরতলির অধিকাংশ সড়ক বেহাল। চলাচলে দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। সন্ধ্যার পর সড়কবাতি না থাকায় চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে। এতে বাড়ে চোরের উৎপাত।

কর নিয়ে ক্ষোভ পৌরবাসীর
পৌরসভার কর বিভাগ জানায়, বর্তমানে ৫,৪৮৫টি বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হোল্ডিং করের আওতায় রয়েছে। চলতি বছর কর নির্ধারণের পর অন্তত ২,০০০ নাগরিক অতিরিক্ত করের প্রতিবাদ জানিয়ে পুনর্নির্ধারণের আবেদন করেন। পরে শুনানির মাধ্যমে তা আংশিক কমানো হয়।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের টাওয়ারপাড়ার বাসিন্দা আশিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত বছর আমার হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ২৫০ টাকা; এ বছর করা হয়েছে ৯০০ টাকা।’ ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিথলিয়াপাড়ার বাসিন্দা বেলিনা খাতুন জানান, তাঁর বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ৩৬০ থেকে বাড়িয়ে একবারে ৩,৮৫০ টাকা করা হয়েছিল। আবেদনের পর শুনানির মাধ্যমে তা ৭৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
অভিযোগ বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত সচিব আক্তারুজ্জামান বলেন, প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে চার কিস্তিতে ৬০-৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে, যা দিয়ে কিছু রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়। এ ছাড়া অন্য দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন রাস্তাসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। তিনি দাবি করেন, পৌরবাসী মোটামুটি সেবা পাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, চলতি বছর ২৬ লাখ টাকা বেসরকারি কর ও ৩৬ লাখ টাকা সরকারি কর ধার্য করা হয়েছিল। সরকারি কর পুরোপুরি আদায় হলেও বেসরকারি কর আদায়ে কিছুটা সমস্যা হয়। এই সংগৃহীত কর ও হাটবাজার ইজারা থেকে পৌরসভার নিজস্ব তহবিল দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।
পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেন, পৌরসভার টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সভায় ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। 
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘উন্নয়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানুষ বছরের পর বছর ট্যাক্স দেবে, অথচ সেবা পাবে না– এটি হতে পারে না। সেবা পাওয়া নাগরিকদের অধিকার।’

আরও পড়ুন

×