রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংবাদিক-শিক্ষার্থীর ওপর হামলা, জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
গত দুই বছরে সহিংসতার ঘটনা ২০টি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট
সৌরভ হাবিব ও মাইনুল ইসলাম রাজু, রাজশাহী
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৭ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মারধর, হামলা, সংঘর্ষ ও সহিংসতার অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হয়েছেন। কয়েকটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। এতে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ গত রোববার রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে চার ক্যাম্পাস সাংবাদিককে বেধড়ক পেটানো হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগ রয়েছে।
আহত সাংবাদিকরা হলেন– সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান কোরবান।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের উপস্থিতিতেই তাদের ওপর হামলা হয়। পরে প্রক্টর বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।’ তাঁর দাবি, পুলিশকে ডাকা হলেও তারা ঘটনাস্থলে আসেনি।
হামলার পর হলের ফটকের সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ মো. মাহবুবার রহমানের বিরুদ্ধে। আন্দোলনের পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের করা মামলায় তাদের নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল রাবি শাখার তিন সদস্যকে বহিষ্কার এবং আরও ছয়জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
আগেও হামলা-সংঘর্ষ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিভিন্ন ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে আইন ও মার্কেটিং বিভাগের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহের জন্য ভিডিও করায় বণিক বার্তার এক প্রতিনিধিকে মারধর এবং ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগ ওঠে।
গত বছরের জানুয়ারিতে বাস্কেটবল খেলা এবং ফেব্রুয়ারিতে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। ফেব্রুয়ারির ঘটনায় এক শিক্ষকসহ ২০ জন আহত হন। মে মাসে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ওপর হামলার অভিযোগে ছয়জন আহত হন। জুলাইয়ে রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতিতে এক সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন।
এর পরও সহিংসতার ঘটনা থামেনি। গত বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের এক ফিজিওথেরাপিস্টকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সেপ্টেম্বরে পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের সময় উপাচার্যসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাদানুবাদ ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। নভেম্বরে ক্যাম্পাসসংলগ্ন একটি রেস্তোরাঁ থেকে এক শিক্ষার্থীকে মুখোশধারীরা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
গত ২২ এপ্রিল চারুকলায় বসাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের জুন মাসে র্যাগিংয়ের ভিডিও করায় দুই সাংবাদিকসহ রাকসু নেতাদের মারধর ও হেনস্তা করেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে প্রক্টরের দপ্তরে এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করেন রাকসুর জিএস আম্মারসহ রাকসু নেতারা। এ ঘটনার পরে রাকসু জিএসের ওপর হামলা হয়েছে দাবি করে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করেন রাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। আম্মার লাঠি হাতে গ্রন্থাগারের ভেতরে শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পেটাচ্ছেন, এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। আম্মার নিজেকে পরিবেশগত শিবির দাবি করলেও তিনি ছিলেন শিবিরের ‘সাথি’। নৈতিক স্খলনের দায়ে বহিষ্কার হন গত বছরের সেপ্টেম্বরে।
গ্রন্থাগারে হামলার ওই ঘটনায় ভিডিও ফুটেজে তথ্য-প্রমাণ থাকা, তদন্ত কমিটি ও আদালতে মামলা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অথচ হামলার দিন পিটিয়ে আহত করা শিক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় আরেক দফা পেটানো হয়। পরে আহত ওই শিক্ষার্থীদেরই গ্রেপ্তার করা হয়। আম্মারসহ অন্য হামলাকারীদের আজও বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছেন, ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় তারা স্বাভাবিক পরিবেশে চলাফেরা ও পড়াশোনা করতে পারছেন না।
জবাবদিহির প্রশ্ন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সদস্য শামিম ত্রিপুরা বলেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীরা একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু সহিংসতার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ পরান বলেন, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তির সুযোগ কমত।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ হলে পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আব্দুল আলীম সমকালকে বলেন, ‘কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা বিগত সময়ে গিয়েছি। শৃঙ্খলাবহির্ভূত ঘটনাগুলোর বিষয়ে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা গ্রহণ করব’।
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- সাংবাদিক
- হামলা